Friday, 19 June 2020

রেল কলোনির আড্ডা ( পর্ব ২)

ওভালের সাথে জড়িয়ে আছে আমার ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি । ১৫ই আগস্টের আগে বৃষ্টি হওয়া যেন প্রকৃতির থেকে পূর্ব নির্ধারিত ছিল আর তার ফলে পরের দিন মাঠের কাদা ঢেকে ফেলতে লাল পাথর গুঁড়ো কি করে ভোলা যায় । সাদা জামা প্যান্ট এর অবস্থা যে কি হতো তা একমাত্র চিত্তরঞ্জন বাসীরাই জানে । এদিকে কাক ভোরে স্কুল থেকে হাঁটা পথে ওভাল যাত্রা শুরু হত । তারপর সেখানে এটেন্ডেন্স নেওয়া হতো । কিছু কিছু বিচ্ছু ছেলে অবিশ্যি আগে ভাগেই মাঠে পৌঁছে যেত এবং সুযোগ বুঝে নিজের স্কুলের দলে এসে মিশে যেত । কারুর চেনবার বা ধরবার জো ছিল না । 


এই একই ঘটনা দেখা যেত ২৬সে জানুয়ারি । ফ্ল্যাগ হোস্টিং , জি এম এর ভাষণ , মার্চ পাস্ট , মাস ড্রিল , ইন্টারস্কুল স্পোর্টস এ সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত ওভালের ওই গোলাকারের মধ্যে । এছাড়া বাবার মুখে শুনতাম কোন এক সময় ওভালের এই মাঠে এককালে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রাদল আসতো । আর সত্যি বলতে চিত্তরঞ্জন চিরকালই শিল্পীদের মাতৃস্থান হয়ে থেকে গেছে । অগুনতি শিল্পী এই চিত্তরঞ্জনে জন্মেছে , বড় হয়েছে ; আবার অনেক শিল্পী কর্মসূত্র ধরে একসময় এসেছিল এই রেলশহরে । ভাবা যায় ওভালের ওই পরিধির মধ্যে আশা ভোঁসলে , রাহুল দেব বর্মনের মত নামি শিল্পীরাও অনুষ্ঠান করে গেছেন । সত্যিই এই শহরের বহুমুখী দিক আকৃষ্ট করে যতবার তার দিকে ফিরে তাকাই । তবু চিত্তরঞ্জন সব সময় একটাই মন্ত্র শিখিয়েছে সবাইকে , দূরে যাওয়ার মন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে  , নিজের পায়ে দাঁড়াতে । রেল ইঞ্জিনের এই শহর তাই তো রেল সুবিধা দিয়ে গেছে আমাদের বারবার যাতে যাতায়াতের সমস্যা না হয় । উন্নতির দিকে যাত্রা , প্রগতির দিকে যাত্রা । আর যাত্রা বললাম যখন তখন শ্রীলতার মাঠ কি ভোলা যায় । রাত জেগে যাত্রা দেখার সুযোগ আমার আজও হয় নি কিন্তু বড়দের মুখ থেকে শুনেছি , কত নামি দামি শিল্পীরা ছুটে এসেছে চিত্তরঞ্জনে শো করতে । তাদের মধ্যে কিছু নাম বলছি , কুমার শানু , নচিকেতা , রবি ঘোষ , পি সি সরকার প্রভৃতি ; কারন সব নাম নিলে চিত্তরঞ্জন ভরে যাবে তবু নাম শেষ হবে না । ওভালের পাশেই  চিত্তরঞ্জন গেস্ট হাউস ও তার সামনে অবস্থিত শিশু বিহার স্কুল । এই ৬৩ নম্বর রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেও ১ নম্বর গেটে পৌঁছানো যায় । সেক্ষেত্রে পথে দেখার মত দাঁড়িয়ে সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট স্কুল । এই ১ নম্বর গেটে যাওয়ার আরো দুটি রাস্তা আছে যার একটি অফিসার কলোনি বা সানসেট এভিনিউ আর একটি ম্যানগ্রোভ এভিনিউ বা মূল বাস রাস্তা । সে দুটি সম্বন্ধে পরে বলবো একদিন । 


ম্যানগ্রোভ এভিনিউ আর গণপতি এভিনিউ একই রাস্তার দুটো নাম । গণপতি হাট সংলগ্ন রাস্তার নাম গণপতি এভিনিউ আর ১ নম্বর গেট থেকে ওভাল অবধি এই রাস্তার নাম ম্যানগ্রোভ এভিনিউ । ওভালের ঠিক উল্টো দিকে এস পি ইস্ট বাজার আর বাজারের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রঞ্জন সিনেমা ও বাসন্তী ইনস্টিটিউট । রঞ্জন সিনেমাটি বর্তমানে আধুনিকতার ছাপ লাগলেও , পুরোনো হলে বাবার হাত ধরে দেখা ইংরেজি সিনেমা দেখার মজা আজও মনে লেগে আছে । তখন হলটিতে নতুন সিনেমা লাগতো না । রিলিজ হয়ে যাওয়া সিনেমা অনেক হাত ঘুরে এসে পৌছাত হলের পর্দায় । তবু লোকের আগ্রহ কোন ভাবেই কম ছিল না । তাছাড়া রঞ্জনে মাঝে মাঝে জলসার আসর বসতো । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর মত নামি শিল্পীও এই রঞ্জনে জলসা করে গেছেন । এস পি ইস্ট মার্কেট থেকে বাস রাস্তা ধরে গণপতি এভিনিউ ধরে হাঁটলে পৌঁছে যাওয়া যায় এরিয়া ২ ডিস্পেন্সারি র সামনে । এই ডিস্পেন্সারির ঠিক পাশেই এক কালে মহিলা মহলের দুর্গাপুজো হতো । এই পুজোর বৈশিষ্ঠ ছিল সম্পূর্ণ পুজোটি মহিলা দ্বারা পরিচালিত ছিল এবং পুজো কমিটিতে কোন পুরুষ সদস্য ছিল না । বেশ কিছু বছর পুজো হওয়ার পর পুজোটি অবশেষে বন্ধ হয়ে যায় । তবে এর স্মৃতি আমার মনে আজীবন জ্বলজ্বল করবে । 


এই পথ ধরে আর একটু এগিয়ে গেলেই এস পি নর্থ মার্কেট । এই বাজার এর বেশ কিছু স্মৃতি পরের পর্বে আলোচনা করবো , কেমন ।
নর্থের বাজারে ঢুকেই পড়লাম যখন তখন আজ আর কোন কথা বলবো না । বরং একটা কবিতা হয়ে যাক আজ । আরে আরে মুখ ভার করলে চলবে ? চিত্তরঞ্জনে এলে আড্ডা না দিয়েই চলে যাবে ? চিত্তরঞ্জন মানেই তো আড্ডার শহর । চিত্তরঞ্জন মানেই তো হুল্লোড়ের শহর । শীতের সন্ধ্যে বেলা সকলে গোল করে বসে আগুন সেঁকা আর গরমে ঘরে কে ঢুকবে ? ভেতরটা ভ্যাপসা । পাপাই , বুকু , মিঠু , ফুচান , আমি , পুকান , পোষন সবাই বোস আজ । আড্ডা দেবো জমিয়ে । সামনে না পারি এই বইয়ের পাতায় সকল চিত্তরঞ্জন বাসীর মহা আড্ডা । সবার আমন্ত্রণ কেন ? কারন এ শহর ভেদাভেদ জানে না তাই । কবিতাটা আমার সাথে বলো , পুরোনো প্রেমিকার কথা মনে পড়ে যাবে । পুরোনো প্রেমিকাটা কে ভাবছো তো ? দুর্গা পূজার এই নর্থের বাগানেই একটা ঝালমুড়ি খাইয়ে চারদিন চুটিয়ে গল্প করেছিলে যার সাথে ভলেন্টিয়ারের বেঞ্চে বসে বসে । তার কথায় বলছি গো । এবার আসর শুরু করি তাহলে আজকে ?  


নর্থ মানেই রাত জাগা আড্ডার মহড়া 
নর্থ মানেই চা সিগারেট , মিষ্টি আর সিঙ্গারা 
নর্থ মানেই মন্টু ঘোষ 
নর্থ মানেই ডালপুরি , রসগোল্লা 
নর্থ মানেই অজানতিক ফুটবল 
আর স্কাউটে র ছেলে ছোকরা ।
নর্থ মানেই দুর্গা পুজো - প্রস্তুতি থেকে বিসর্জন 
নর্থ মানেই বিশাল ঠাকুর - মেলায় বসে বসে 
ভাজা সেই বাদাম ভোজন ।
নর্থ মানে বন্ধু হয়ে যাওয়া মুহূর্ত 
নর্থ মানে পাশের বাড়ির খবর রাখা 
নর্থ মানেই দেওয়ালির খুব ভোরে 
ক্যান হাতে মণ্ডপে মণ্ডপে ভোগ আনা ।
নর্থ মানে দোল খ্যালে - হিন্দু থেকে মুসলমান 
নর্থ মানে ঈদের সিমুই , বড়দিনের কেক 
আর একটা পুরোনো নেশা , নতুন বোতলে সিল করা ।


সুন্দর পাহাড়ি নর্থ বাজারে ঢুকেই পড়েছি যখন তখন একজনের নাম না বললে ভীষন অন্যায় হবে । তিনি হলেন মন্টু ঘোষ । মিষ্টির জগতে এক উল্লেখযোগ্য নাম এই মন্টু ঘোষ । তবে তার থেকেও উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় তার কর্ম উদ্যম মানসিকতা । সকাল থেকে রাত অবধি দোকান ও রান্না হওয়া মিষ্টি তৈরির প্রবল তত্ত্বাবধান তার সফলতার মূল মন্ত্র ছিল । ধীরে ধীরে ওই স্থান মানুষের মিলনস্থলে পরিনত হয়ে ওঠে । একসময় চিত্তরঞ্জনে চাকরি নিয়ে এসেছিলেন খরাজ মুখার্জীর মতো অনেকেই । সন্ধ্যে বেলা ওই দোকানের সামনের ফাঁকা জায়গায় সময় কাটিয়ে গেছেন তাদের মত নামি দামি ব্যক্তিরাও । যারা এখনো এ দোকানে যান নি তাদের জন্য বলে রাখি  "কালাকাঁদ 'আর "ভাপা' সন্দেশ এর সাথে মন্টু ঘোষের নাম মিষ্টির ইতিহাসে প্রচণ্ড ভাবে জড়িত । 


এছাড়া নর্থের দুর্গা পুজোর একটা ইতিহাস আছে । পুজোর সময়ে নানা মানুষ ও নানা দোকানের সমাহারে জায়গাটি হয়ে ওঠে বহু মানুষের মিলন ক্ষেত্র । পাশাপাশি পুজোর ঐতিহ্য স্থানটিকে করে তোলে চিত্তরঞ্জনের ম্যাডক্স । তবে শুধু নর্থের দুর্গাপুজো নয় , অন্যান্য অঞ্চলের পূজগুলিও যে কোন এলাকাকে টেক্কা দিতে পারে এ ক্ষেত্রে । সেসব পুজো নিয়ে একটা গোটা পর্বে আলোচনা করবো । এখন আপাতত এগিয়ে চলি । 


নর্থের প্রতিবেশী বলতেই যে অঞ্চলের নাম মানুষের মুখে উঠে আসে সেটি হলো সিমজুরি । বাজার ছেড়ে বড় বাস রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই চার মাথার মোড় । বাদিকে কুশবেদিয়া যাওয়ার উন্মুক্ত পথ আর ডান দিকে ফতেপুর যাওয়ার রাস্তা । সিমজুরির প্রবেশ দ্বার এখান থেকেই শুরু । 
সিমজুরি নিয়ে বলতে পারা , লিখতে পারা এ নেহাতই দুঃসাহস আমার কাছে , কারন এত ইতিহাসময় আমাদের চিত্তরঞ্জন শহরটি যে প্রথম দিকের শহরের বর্ণনার জন্য আমাকে বিভিন্ন জনের অভিজ্ঞতা তুলে নিতে হয়েছে । ১৯৪৩ সালে সিমজুরি ছিল সাঁওতাল সম্প্রদায়ভুক্ত একটি গ্রাম । অজয় নদের পাশে অবস্থিত এই গ্রামটি কোনদিন চিত্তরঞ্জন ভুক্ত হবে একথা তখন কেউ কোনদিন ভাবতেও পারে নি । 


১৯৫০ সালে সিমজুরি অন্তর্ভুক্ত হলো পশ্চিমবঙ্গে, অন্তর্ভুক্ত হলো চিত্তরঞ্জন নামক এক রেল নগরীতে । নগরায়নের ছাপ লাগলো আদিবাসী এই অঞ্চলের বুকে । জীবনযাত্রা পরিবর্তন হতে শুরু করলো সিমজুরি , ফতেপুরের মতো এলাকাগুলো । শুধু কিছু চিহ্ন ভগ্ন রুগ্ন দশায় দাঁড়িয়ে রইল সভ্যতার মধ্যেও , ঠিক যেমন ৮৮ নং রাস্তায় গেলে সিমজুরির সেই কেল্লা আজও দেখা যায়। 



( চলবে )

Thursday, 11 June 2020

রেল কলোনির আড্ডা


( তথ্য আরো অনেক কথা বলতে পারে , কিন্তু এই লেখাটি আমার দেখা ও বাবা জ্যঠাদের মুখ থেকে শোনা অভিজ্ঞতা ) 


গ্রাম্য পরিস্থিতির মধ্যেই বড় হয়েছি । গ্রাম চিরকাল তাই আমার মনের মধ্যেই রয়ে গেছে একটা ছাপ হয়ে । সত্যি বলতে গ্রাম নিজের বাহ্যিক দিক থেকে শহর থেকে অনেক পিছিয়ে । অনেক গ্রাম এখনো অন্ধকারে ডুবে আছে । এখনো বহু গ্রাম অনেক পিছিয়ে । তবে গ্রামের আভ্যন্তরীণ রূপটা সত্যিই মনহারি । সেই ভাগা , কুসবেদিয়ার আতিথেয়তা আমাকে খুব টেনে নিয়ে যেত । আর যেটা আরো বেশি আকৃষ্ট করতো তা হল তাদের সরলতা । ওই সরল আদিবাসীদের মুখ চেয়ে মনে হতো না কোনদিন ওরা কাউকে ঠকাতে পারে কখনো । বাবার মুখে এই সাঁওতাল গ্রাম ও আদিবাসীদের নিয়ে অনেক সত্যি ঘটনা শুনেছিলাম । যত শুনতাম ততই এই মন পালাই পালাই করে উঠতো । বেশ অনেকবারই গেছিলাম সেই গ্রামে । মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম ওই মাটির ওপরে বসে । সেই অভিজ্ঞতা আজ না বললে খুব অন্যায় হবে । তবে তার আগে বাবার মুখ থেকে শোনা একটা গল্প বলি । 

চিত্তরঞ্জন শহরে একবার বাঘ বেড়িয়েছিল । সারা গ্রাম রাত জেগে কাটিয়েছিল বেশ কয়েক রাত । বন দপ্তরকে খবর দেওয়া হল , কিন্তু বন দপ্তর বাঘটিকে খুঁজে বের করতে না পেরে ফিরে গেল । তারা ধরে নিয়েছিল অজয় নদ পার করে বাঘটি তৎকালীন বিহারে ঢুকে পড়েছে । কিন্তু তাদের অনুমান সম্পূর্ণ ভুল ছিল । দুদিন এর মধ্যেই বাঘের গর্জনে সারা শহর জেগে উঠল । আদিবাসীরা মাদলের শব্দে ঢেকে ফেললো গোটা এলাকা । মশাল হাতে সারা রাত জুড়ে চললো খানা তল্লাশি । অবশেষে , ভোর বেলায় বাঘটিকে শিকার করা হল , সৌজন্যে সাঁওতাল আর আদিবাসী শ্রেণী । সত্যি অদ্ভুত সেই আদিবাসী ভাবনা , অদ্ভুত তাদের ভালোবাসা মানুষের জন্য , অদ্ভুত তাদের ভালোবাসা আমার শহর চিত্তরঞ্জনের প্রতি । 

চিত্তরঞ্জন শহরে কাটানো দশ বছরে দশ হাজার জীবনের আনন্দ আমি উপভোগ করেছি । উপভোগ করেছি এর ইতিহাস , এই শহরের গরম , এই শহরের শীতের কুয়াশা , আদিবাসী প্রতিবেশী গ্রামের আপনতা , সূর্যোদয়ের ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য্য , গাছপালায় ঘিরে থাকা একটা নাম : শহর থেকে দূরে একটা শহর : চিত্তরঞ্জন । অনেকেই এই শহরটাকে কাড়া নগরী নাম দিয়ে থাকলেও , এই শহর কোনদিন কাউকে নিজে থেকে বেঁধে ফেলেনি , বরং এই শহরে যে বা যারা এসেছে , তারাই বাঁধা পড়ে গেছে এর মায়ায় । বহু দিনের চেষ্টার মধ্য দিয়ে আমার প্রাণের শহরটাকে সকলের প্রাণে মিলিয়ে দেওয়ার এক ছোট্ট প্রচেষ্টা এই লেখা । শুরুটা তার হোক আমার এলাকা এরিয়া ২ অথবা সুন্দর পাহাড়ি নর্থ থেকে , যেখানে কাটানো দশ বছরে দশ কোটি ঘটনা একটু একটু করে ফুটিয়ে তুলবো আর তার মধ্যে দিয়ে সবাই দেখতে পাবেন একটা ভারতবর্ষের ছবি ; যার বৈচিত্রের মধ্যেও কত ঐক্য । তাহলে ক্যামেরা ঘোরানো যাক আর অফিসার কলোনি ধরে সটান ঢুকে পড়া যাক ৭০ নম্বর রাস্তার এক প্রান্তে যার কোয়ার্টার নম্বর শেষ হয়েছে ৭৬/বি - তে । এর পড়েই একটি চার মাথার মোড় পার করলেই ঢুকে পড়া যায় অফিসার কলোনির বাংলোর দরজায় । এই পিচ রাস্তার দুদিকে সারিবদ্ধ ভাবে বাংলো দাঁড়িয়ে আছে আর পথটি শেষ হয়েছে মিহিজাম সংলগ্ন ১ নম্বর গেটের কাছে । পথটি স্থানীয়ভাবে সানসেট এভিনিউ নামে পরিচিত । রাস্তার প্রায় শেষের দিকে অবস্থিত জি এম বাংলো আর ঠিক তার উল্টোদিকে রয়েছে একটি বন সৃজন প্রকল্প আর একটি গল্ফ কোর্স । এই স্থান থেকে সূর্যাস্ত দেখার মজা সত্যিই অপরূপ ও মনহরিনী । 

চিত্তরঞ্জন রেলস্টেশন থেকে বেরিয়ে যে রাস্তাটা বেরিয়ে আসছে তার বাইরে রয়েছে মিহিজাম । রেলস্টেশন এর প্ল্যাটফর্মটি বাঙলায় থাকলেও , স্টেশনের বাইরের এই মিহিজাম শহরটি কিন্তু বিহার ( বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের ) অন্তর্ভুক্ত । স্টেশনের পাশ থেকেই দুমকা , রাঁচি , দেওঘর প্রভৃতি ঝাড়খণ্ডের বাস ছাড়ে । বাস স্ট্যান্ডের সামনে রিকশা স্ট্যান্ড এবং সেই রিকশা স্ট্যান্ড পার করে হাটতে থাকলে দুপাশে তরি তরকারি বাজার । এরই মধ্যে দিয়ে রাস্তাটি অটো স্ট্যান্ড পার করে হাজির হয় একটি গেটের সামনে । গেটের দুপাশে বাংলা ও বিহারের ( বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের) সীমানা নির্ধারক প্রাচীর পূর্ব পশ্চিম দিক বরাবর দাঁড়িয়ে । এই গেটটি ১ নম্বর গেট নামে পরিচিত । ১ নম্বর গেট পার করেই চিত্তরঞ্জন শহরটির মূল ভূখণ্ড শুরু হয় । 

এই ১ নম্বর গেটের পাশেই ( চিত্তরঞ্জনের দিকে ) কলকাতা , আসানসোল , বর্ধমান , মালদা প্রভৃতি জায়গায় যাওয়ার বাস ছাড়ে । এখান থেকে চিত্তরঞ্জন হলদিয়া ভায়া কলকাতা যাবার এস বি এস টি সি বাস পরিষেবা পাওয়া যায় । এছাড়াও অসংখ্য মিনি ও লোকাল বড় ও এক্সপ্রেস বাসও এখান থেকে পাওয়া যায় । 

চিত্তরঞ্জন শহরটি তৈরি হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে । তার আগে অবধি জায়গাটি সাঁওতালদের বাসস্থান ছিল এবং এর পর রেল কোম্পানি এই জায়গাটি কারখানা নির্মাণ করতে এগিয়ে এলে সাঁওতালদের থেকে প্রচন্ড প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় । অনেক লড়াই এর ইতিহাস লেখা হয়েছিল একটি আধুনিক রেলশহর নির্মাণের পিছনে । এই লড়াইয়ের ইতিহাস আজও লিপিবদ্ধ আছে ডিভি বয়েজ স্কুলের পাশে গণপতি হাটের ভেতরে । অবশেষে ১৯৫০ সালে কারখানায় উৎপাদন শুরু হয় এবং ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এখানে কয়লায় টানা ইঞ্জিন ও ডিজেল ইঞ্জিন তৈরি করা হতো । তবে পরবর্তীতে এই কারখানায় ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিন নির্মাণ শুরু হয় । 

চিত্তরঞ্জন শহরটির নাম রাখা হয় দেশবন্ধুর নাম অনুসারে এবং এখানে একটি অডিটোরিয়ামের নাম বাসন্তী দেবীর নামানুসারে করা হয় । অন্যটি নামকরণ করা হয় শ্রীলতার নামানুসারে । বাসন্তীর ঠিক পিছনে শহরের একটি সিনেমাগৃহ রঞ্জন সিনেমা অবস্থিত । 

বর্তমানে রেলের উদ্যোগে রঞ্জন সিনেমাটির আধুনিকীকরণ করা হলেও এই শহরের দ্বিতীয় সিনেমা শ্রীলতা হলটি আর জীবিত নেই । শ্রীলতার ঠিক সামনে রবিন্দ্রমঞ্চ তৈরি করা হয়েছে । এই রবিন্দ্রমঞ্চে শহরের বিভিন্ন জলসা ও অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে । এই হল খুবই সংক্ষিপ্তভাবে চিত্তরঞ্জন শহরটির একটি নকশা , যার কেন্দ্রে রয়েছে রেলইঞ্জিন কারখানা এবং তাকে ঘিরে বিভিন্ন আয়োজন । এছাড়াও শহরটির নানা দর্শনীয় জায়গা আছে যা আগামীতে বলবো । তার সাথে এও বলবো যে রেল এই অঞ্চলটিকে কেন বেছে নিয়েছিল কারখানা নির্মাণের জন্য ।

সত্তরের যে কোয়ার্টার এ আমার জীবনের মূল্যবান সময় কেটেছে আজ সেই পথ ধরে বেড়িয়ে পড়বো একটু আশে পাশের সফরে । মূল বাস রাস্তা বা চ্যানাচুর মোড় থেকে বেশ কয়েকটা মোড় পেড়িয়ে সত্তরের মোড় । এই চ্যানাচুর মোড়  থেকে ডানদিকে তাকালে দেখতে পাবেন দেশবন্ধু বয়েজ ও দেশবন্ধু গার্লস স্কুল । দেশবন্ধু বয়েজ এর সামনে অবস্থিত গণপতি হাট , যা চিত্তরঞ্জনের প্রথম এডমিনিষ্ট্র্যাটিভ বিল্ডিং ছিল । বর্তমানে এই ডিভি বয়েজ স্কুলের পাশে যে ফাঁকা জায়গা ছিল সেখানে তৈরি হয়েছে ইন্ডোর স্টেডিয়াম । সারা ভারতের নানা প্রতিযোগিতা এই ইন্ডোর স্টেডিয়ামে হয় আর এটা সত্যিই এক গর্বের বিষয় । গণপতি হাট নিয়ে পড়ে একসময় বলবো , তবে আজ তার পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে এগিয়ে যাই আরো খানিকটা । সামনেই একটি মোড় যেখানে বর্তমানে তৈরি হয়েছে চিত্তরঞ্জনের ৫০ বছর পূর্তিতে একটি হাত । এই রাস্তা শীত , গ্রীষ্ম , বর্ষা সমস্ত ঋতুতে কত সাইকেল , স্কুটারের ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে তা একজন চিত্তরঞ্জন বাসী খুব ভালোভাবে জানে । তবে চিত্তরঞ্জন কোনদিন এর জন্য কোন অভিযোগ করে নি । বরং গণপতি এভিনিউর এই পথ চিরটাকাল কলকাতার পথ ঘাটকে অনায়াসে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বারবার । কোন ফাটল নেই , বর্ষার জল জমে না কোনদিন । এই হল আমার শহর । তবে , এই শহরের আর একটি দিক আছে যার সাথে স্মৃতি আকড়ে পড়ে থাকে । সেটা হল ওভাল মাঠ আর তার সংলগ্ন অঞ্চল । পথ চলতে চলতে সেটাও জানাবো একদিন না হয় ।

সত্তর থেকে শুরু করে একটা চক্র শেষ করে ফিরলাম ঠিকই , তবে অনেক পথ ঘুরে আসা এখনো বাকি থেকে গেছে । বাকি থেকে ওভালের লাল মাটি অথবা কুয়াশা ভেজা ঘাসের মধ্যে আড়চোখে দেখে নেওয়া নিজেদের প্রেমিক অথবা প্রেমিকার মুখখানা , দেখে নেওয়া বন্ধুত্বের প্রাপ্তিগুলো , স্যারদের সাথে মেতে ওঠে প্রাপ্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক উল্লাসে , জনগণমন র গানে মধ্যে জেগে ওঠা দেশ প্রেম -- এ সবই তো একটা চ্যাপ্টারে বলে দিতে পারবো না । কারন চিত্তরঞ্জন এক চ্যাপ্টারের গল্প নয় । এই শহর কিছু নেই এর মধ্যেও অনেক কিছু আছের কথা । এই শহর স্কুল বাঙ্ক করার মধ্যেও স্কুলে ফিরে আসার শহর , এই শহর একটা মিলন ক্ষেত্র - গ্রাম ও শহরের , আদিবাসী ও শহরের , আদিম ও প্রাচীনের । আগেই বলেছিলাম না , এই শহর একটা গোটা ভারতবর্ষ : বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য । আজ যাত্রা আবার শুরু করবো , ভাগ করে নেবো কিছু অভিজ্ঞতা তবে ওভালের দিকে নয় । আজ ৭১ ও ৭৩ পার করে নেমে যাবো নীচে , সাঁওতাল পরগনার মধ্যে ; যেখানে প্রায় যেতাম আমার ছেলেবেলায় । একবার ঘুরে আসবো সেই শান্তির আশ্রয়স্থল শিব মন্দিরে । তাহলে চলো বেড়িয়ে পড়ি । শুভস্য শীঘ্রম । 

সত্তরের পাশে ৭১ ও ৭৩ নম্বর রাস্তা পার করতে করতে প্রায়ই ভাবতাম , এরা বুঝি হিসাব জানে না । তাই ৭২ নম্বরটা হিসাব করে নি । কিন্তু তার পরেই ৭৩ এর মোড়ে পৌঁছে তিনটে জিনিসের আকর্ষণ আমাকে কেমন যেন সব ভুলিয়ে দিত । 

ক) পন্ডিতজীর পানের দোকান । প্রতি রবিবার দুপুরে  মাংস ভাত খেয়ে বাবার সাথে গিয়ে হাজির হতাম সেই পানের দোকানে । বাবাকে দেখলেই পন্ডিতজী বুঝে যেত দুটো মিষ্টি পান আর আমার ফাউ হিসাবে পাওনা ছিল এক মুঠো মৌরি আর চেরি । সেই মৌরি চেরির স্বাদ আজও ভুলতে পারি নি । আজকাল অনেক মশলা দিয়ে তৈরি দামি দামি মিষ্টি পানের স্বাদ ওই সাধারণ পানের কাছে হার মানতে বাধ্য । পন্ডিত জি খুব সুন্দর রাম চরিত মানস পাঠ করতেন । অনেকবার শুনেছি সেই সুর আর যত শুনেছি ততই হারিয়ে গেছে তার মাধুর্য্যে । পন্ডিত জির বাড়ি ছিল ৭১ নম্বর রাস্তায় আর তার বাড়ি যেতাম শুধুমাত্র তার পোষা কুকুরটিকে দেখবো বলে । 

খ) ৭৩ এর শিব মন্দির । পাহাড়ের উপর অবস্থিত এই শিব মন্দির আমার ছোটবেলার অনেক স্মৃতি বহন করে । যখনই মন খারাপ হয়ে যেত তখনই এই মন্দিরে এসে বসে থাকতাম । এক অদ্ভুত শান্তি ছিল মন্দির জুড়ে । বাবার মুখে শুনেছি মন্দিরটি আগে ছোট্ট মতন ছিল , পরে সেটিকে বড় মন্দির করা হয় । শিবরাত্রি ও নীলের উপসে সেই মন্দিরে কতবার গেছি তার হিসেব নেই । আর তাছাড়া নর্থের শিব মন্দির ছিল আমার কাছে মন পরিবর্তনের এক অমূল্য জায়গা । পাহাড়ের ওপরে বসে সাঁওতাল পরগনার রূপ দেখতে দেখতে কোথায় যে হারিয়ে যেতাম তার ঠিক ঠিকানা ছিল না কোন । চারিপাশের সবুজ ধানক্ষেত আর অন্য পিঠে গড়ে ওঠা নগর সভ্যতা আমাকে অনায়াসে আকৃষ্ঠ করতো বার বার । সেই শিব মন্দিরের পাশে ছিল একটা রাম ও হনুমান মন্দির । জন্ম অষ্টমী ও রাম নবমিতে সেখানে ভিড় উপচে পড়তো বরাবরই ।

গ) সাঁওতাল গ্রাম ও তাদের সংস্কৃতি । সাঁওতাল পরগনায় কত বিকেল , কত সকাল আমি কাটিয়েছি তার হিসেব নেই । সেই আল , ধানের শীষ তুলতে যাওয়া , সেই কাঠের ব্রিজ , সেই মাটির ঘর , সেই গোবরের গন্ধ , সেই ভুট্টার স্বাদ , সেই গরম গরুর দুধ , সেই বিহুর আনন্দ , সেই মনসা পুজোর খাসি খেতে যাওয়া আর সবার ওপরে সেই সাধারণ আদিবাসী পরিবারগুলো আজও আমাকে টেনে নিয়ে যায় আমার স্বপ্নের শহর চিত্তরঞ্জন । 

৭৩ এর এই তিনটি জিনিস ছাড়াও যেটা আমার খুব মনে পড়ে সেটা হল ৭৩ এর গাছ , পাখি ও সবচেয়ে বেশি ছেলেবেলার দিনগুলো । ছট থেকে দোল , ঈদ থেকে ক্রিস্টমাস এই শহর সবার সাথে মিলে উৎসবে মেতে উঠতো বারবার আর এই ৭০ , ৭১ ও ৭৩ আমার কাছে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় স্বাক্ষী । এখানকার মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ আজও মনকে ভীষন টানে । আর এই সব অভিজ্ঞতা নিয়েই তো স্বপ্নের শহর নির্মাণ হয় ।

আমার কোয়ার্টার থেকে ছেড়ে আসা একদিক আজ ঘুরে এসে মন বেশ ভারাক্রান্ত । তাই বাড়ি ঢুকে পড়বার কোন চান্স নেই এখন । বরং ওভালের দিকটা যেটুকু বাকি ছিল সেখান থেকে আবার একবার ঘুরে আসা যাক । আর ফেরার পথে সানসেট এভিনিউ এর মহুয়ার বুক চিরে দেখে নেব সূর্যাস্তের লাল মুখখানা । তাহলে চলুন , লেটস গো ।



( চলবে )

Monday, 8 June 2020

ভারত , নারী , সমাজ এবং .....



ভারতীয় ইতিহাস বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ইতিহাসের মধ্যে অন্যতম । সিন্ধু সভ্যতার হাত ধরে যে ইতিহাসের ধারা প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল তা আজও অক্ষত । তবে সময়ের সাথে সাথে ভারতীয় সমাজে পুরুষতন্ত্রের যে প্রাধান্য দেখা গেছে তা ভারতের ইতিহাস থেকে অনেকটাই ভিন্ন । যে দেশ লক্ষ্মী , সরস্বতী , দুর্গা , কালি , দশমহাবিদ্যার উপাসনা করে থাকে , সেই দেশেই আজ কন্যারা সর্বাধিক বিপদে । রাস্তার অন্ধকারে ধর্ষণ আজ প্রতি দিনের ঘটনা । কন্যা ভ্রূণ হত্যার ফলে লিঙ্গ অনুপাত হ্রাস পেয়েছে এই সমাজে । অথচ এই দেশের গৌরবান্বিত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে , নারীদের স্থান এই সমাজে কত উন্নত ছিল ।
আজ এই ইতিহাসের দিকেই আপনাদের দৃষ্টি ফেলতেই আমার এই প্রচেষ্টা :-

আর্য সমাজ :- আর্যদের যুগে মহিলাদের দেবী হিসাবে স্থান দেওয়া হয় । গার্গী , মৈত্রী , লোপামুদ্রা , খনার নাম আজ জগৎ খ্যাত । পুরুষদের পাশাপাশি এই সমস্ত নারীরাও ভারতের ইতিহাসে যে অবদান রেখে গেছে তা সত্যই প্রশংসনীয় ।

“Nijabhujadanda nipatitakhanda
Vipatitamunda bhataadhipate
Jaya Jaya he Mahisasuramardini ramya
Kapardini shailasute " .....

মা দুর্গার ওপর রচিত এই শ্লোকে তার বীরত্ব আমরা দেখতে পাই যেখানে তিনি একাই শত শত যোদ্ধাকে নাশ করছেন । নারীদের দক্ষতার এরকম হাজার হাজার লক্ষ্য করা গেছে সে যুগের লেখাতে । বাস্তবেও নারীদের হাতেই তাই সমস্ত ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছিল তখন ।
দুর্গা বা কালি ছেড়ে এবার রামায়ন ও মহাভারতে ফিরে আসা যাক । সেখানে আমরা বেশ কিছু নারী চরিত্র দেখতে পাই যাদের বাদ দিয়ে মহাকাব্য দুটি কল্পনাও করা যায় না । তাদের বীরত্ব পাঠকের চোখে এক অন্য সম্মানীয় স্থান দখল করে রেখেছে ।
লঙ্কিনী ও শৃখন্ডি চরিত্র দুটির কথা মনে পড়ে । যদিও দুজনেই ছিল পার্শ্ব চরিত্র তবু তাদের যুদ্ধ নিপুনতা বিষয়ে সকলের মনে বাহবা ছাড়া আর কোন শব্দ আসতে পারে না । কন্নড় ভাষায় রচিত জামিনী ভারতম গ্রন্থে  অর্জুনকে এক অচেনা দেশে আবির্ভূত হতে দেখতে পাই আমরা । সে দেশ অনেকটা গ্রিক আমাজনের মত , যেখানে প্রতিটি মহিলার মধ্যেই এক যুদ্ধং দেহি মনোভাব  । কাহিনী অনুসারে এখানের রাজকুমারী প্রমীলা , অর্জুনের অশ্বমেধের ঘোড়াটিকে বন্দি করে রেখেছিল এবং তারই জন্য অর্জুন সেই দেশে উপস্থিত হন ।  পরবর্তীতে অর্জুন প্রমিলাকে বিবাহ করতেও বাধ্য হন । ভেবে দেখুন , অনুভব করুন এই দেশের লাজুক নারীদের সাহসিকতা । এই দেশ ও সেখানকার নারীদের সাহসিকতার বর্ণনা আমরা গুরু মৎসেন্দ্রনাথ এবং গোরক্ষনাথের গল্পেও পেয়ে থাকি ।

সুতরাং , একটা কথা পরিষ্কার যে আর্য সভ্যতা ও প্রাক আর্য সভ্যতায় নারীদের সফলতা এবং সমাজে তাদের উন্নতির ছবি আমরা রন্দ্রে রন্দ্রে অনুভব করতেই পারি । আর এটা শুধু আর্য কাহিনীতেই নয় , ইতিহাসের প্রতি অধ্যায়ের মধ্যেই এই বীরত্ব আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দেখতে পাই । বর্তমান সমাজ হয়তো নিজ দেশের সেই গৌরবান্বিত নারী ইতিহাস ভুলে গেছে ।

মৌর্য সাম্রাজ্য ও তার পরবর্তী ইতিহাস :-  মৌর্য সাম্রাজ্যে মহিলা দেহরক্ষী রাখা হতো , সেকথা ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই জানা যায় । সেই সমস্ত মহিলারা সুসাস্থ সম্পন্ন , কর্মঠ , নির্ভীক এবং যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ছিল । শুধু তাই নয় , সে যুগে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বেশি বিশ্বস্ত বলেও মনে করা হত আর তাই মহারাজ মহিলাদেরই এই বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে থাকতেন । যুদ্ধ ক্ষেত্রে মহিলারা সেবা ধর্ম যেমন নিপুণ কৌশলে সামলাতেন , ঠিক তেমনই প্রয়োজনে সরাসরি মাঠে নেমে যুদ্ধ করে থাকতেন আর এ জন্য তাদের ছোট বেলা থেকেই যুদ্ধ কৌশল শেখানো হতো ।
মধ্য যুগ থেকে সমাজ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে পিতৃ তান্ত্রিক আকার ধারন করলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহিলাদের সুযোগ কমে যেতে থাকে । তবে এসবের মধ্যেও যোগ্যতা নিজের পথ সব সময় তৈরি করে নিয়েছিল । একাদশ শতাব্দীতে ওয়ারঙ্গেলের মহারানী রুদ্রমা দেবী ছিলেন একজন শক্তিশালী যোদ্ধা । তিনি একটি শক্তিশালী সৈন্যদল নির্মাণ করেন এবং প্রতিটি সৈন্যকে মার্শাল আর্ট এর শিক্ষা প্রদান করেন । এর ফলে তার সাম্রাজ্য দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসাবে পরিচয় লাভ করেছিল । আজ আমরা মার্শাল আর্ট বলতে চীনকে চিনি , অথচ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে আমাদেরই দেশে এই বিদ্যার প্রচলনের ইতিহাস । শুধু মার্শাল আর্ট নয় , রুদ্রমা দেবী মল্ল যুদ্ধ ও তরবারি ব্যবহারেও নিপুণ ছিলেন । তার এই শক্তিশালী সাম্রাজ্যের কাছে গঙ্গা বংশ এবং যাদব বংশ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল । শুধু রুদ্রমা নন , এই সময়ে সমগ্র দক্ষিণ ভারত বেশ কিছু শক্তিশালী রানীর উত্থান দেখেছিল -- যেমন মহারাণী আববাক্কা, যার শক্তির কাছে পর্তুগিজ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল ; মহারাণী কেলাডি চেননামমা , যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন । মারাঠারা পর্যন্ত তার শক্তি এবং সাহসিকতায় মুগদ্ধ হয় ; মহারাণী কিততুর চেননামমা , যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করে গেছিলেন ।
এরকম অসংখ্য বীর নারীদের দেশ আমার ভারত । তবু আজও নারী নির্যাতন ঘরে ঘরে , আজও মহিলা জন্ম মানেই অশুচি মনে করা , মহিলা মানেই ভ্রূণ হত্যা , মহিলা মানেই গৃহবন্দি জীবন । এখানেই এ ইতিহাস শেষ নয় । সারা ভারত খুঁজে দেখবো , কথা দিলাম । যতটা ইতিহাস তুলে আনা যায় , আনবো । যদি কিছুটা উপশম হয় কোনদিন ।

উত্তর ভারতীয় সমাজ :- দক্ষিণ থেকে ফিরে আসা যাক ভারতের অন্য প্রান্তে । রাজপুত সম্প্রদায়ের বীরত্বের ইতিহাস আমরা কে না জানি । তবে তার থেকেও উল্লেখযোগ্য হলো রাজপুত সমাজের মহিলাদের ইতিহাস । ভারতের সমগ্র জাতির মধ্যে রাজপুত মহিলারাই মাথা উঁচু করে বাঁচার কথা আমাদের শিখিয়েছিল বারবার । গোন্ডওয়ানার মহারানী বাজ বাহাদুর কে পরাস্ত করেছিল এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ওপর একক শক্তি নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল । অবশ্য শেষ রক্ষা হয় নি এবং একটি তীর চোখ বিদ্ধ করার ফলে মৃত্যু হয় তার ।
রাজপুত মহারানী পদ্মিনির বীরত্বের কাহিনী আমরা কে না জানি । আলাউদ্দিন খলজির হাত থেকে তার স্বামী রাওয়াল রতন সিং কে মুক্ত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ।
গারওয়ালের নাক কাটি রানীর বীরত্বের কাহিনীও কারুর অজানা নয় । সেখানের রানী কর্ণাবতী শত্রুদের নাক কেটে দিত বলে জানা যায় । সুনিপুন অস্ত্র কৌশল না জানলে এটা কোনদিন সম্ভব নয় । দুন উপত্যকায় তিনি মুঘল বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণ একাই প্রতিহত করেছিলেন । বাঙলার রানী ভবশংকরি তার বীরত্বের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন । ভুরসূত অঞ্চলে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য তিনি একাই পাঠানদের প্রতিহত করেছিলেন । পশ্চিমের তারাবাই এর সাম্রাজ্য মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছে অভিশপ্ত হয়ে উঠেছিল । তিনি বহুবার তার সাম্রাজ্যে মুঘল আক্রমণ প্রতিহত করেন , এমনকি ঔরঙ্গজেবের বহু অঞ্চলে তার বিজয় পতাকার বীজ বপন করেছিলেন ।
ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধের ইতিহাসে মহিলা বীরত্বের অবদান কোনদিন কোনভাবেই খন্ডন করা যায় না । ১৮৫৭ র যুদ্ধের শহীদ লক্ষ্মীবাই ও ঝলকারী বাই , মেদিনীপুরের মাতঙ্গিনী হাজরা , প্রীতিলতা ওয়াদেদার হলো সেই সমস্ত ভারতীয় মহিলা যারা সম্মুখ সমরে শুধুমাত্র দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিল । ইতিহাসের পাতায় এই তালিকা সুদীর্ঘ । আস্তে আস্তে সবই আলোচিত হবে এখানে ।

ভারতীয় মুসলিম সমাজ :- ভারতীয় মুসলমান সমাজে পর্দা প্রথার মত অভিশাপ যেমন সত্য ছিল, ঠিক তেমনই সেই সমাজের মহিলাদের বীরত্ব এক অন্যতম সত্য বলে জানা যায় । সুলতানা রাজিয়ার নাম কে না জানে । ইলতুতমিস কন্যা রাজিয়া বেগম একজন দক্ষ ঘোড়সোয়ার ছিলেন এবং তার পাশাপাশি একজন সুদক্ষ যোদ্ধাও ছিলেন । বাবার মৃত্যুর পর তিনি দিল্লির মসনদে বসেন এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব সামলেছিলেন ।
জাহাঙ্গীর স্ত্রী নূর জাহান ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী রমণী । সাম্রাজ্যের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জাহাঙ্গীর যেমন তার সাথে পরামর্শ করে থাকতেন তেমনই প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি রণ ক্ষেত্রে তার স্বামীর প্রাণ রক্ষাও করেছিলেন ।
আহমেদনগর সাম্রাজ্যের চাঁদ বিবির বীরত্বের কথা ইতিহাস আজও মনে রেখেছে । মুঘলদের সাথে যুদ্ধে তিনি নিজে রণক্ষেত্রে নেমে আসেন । যদিও সে যাত্রায় শেষ রক্ষা হয় নি ।
ঊনবিংশ শতকেও আমরা দেখতে পাই ভারতীয় মুসলমান মহিলারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছিল । তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বেগম হজরত মহল , আজিজুন বাঈ প্রভৃতি ।
শুধু রাজ পরিবার অথবা সম্ভ্রান্ত পরিবারে নয় , ভারতীয় সাধারণ মহিলাদের শক্তির কাহিনী ইতিহাসের পাতায় পাতায় ভরে আছে । আমরা আসলে ইতিহাস পড়ে গেছি চিরকাল , জানতে চাইনি কোনদিন । হামপি গুহাচিত্র এবং বেলুর গুহাচিত্রে মহিলাদের মল্লযুদ্ধে অংশগ্রহনের ছবি পাওয়া গেছে । এর থেকে পরিষ্কার যে ভারতীয় মহিলারা নানা রকম আত্মরক্ষা কৌশল জানতো এবং মার্শাল আর্টসের বিভিন্ন কলাকৌশল যেমন সিলাবাম ( লাঠিখেলা ), কুস্তি , কলারি প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান ছিল । তবে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে -- তারা কি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল কোনদিন । তার উত্তর অবশ্যই সদর্থক । আগামী পর্বে ভারতীয় সাধারণ মহিলাদেরই বীরত্বের ছবি তুলে ধরবো আপনাদের সামনে ।


ভারতীয় সাধারণ মহিলা সমাজ :- আগেই বলে এসেছি ভারতীয় মহারানী শুধু নয় সাধারণ ঘরের মহিলাদের বীরত্বের গল্প এদেশের পাতায় পাতায় রয়েছে অমর হয়ে । আমরা হয়তো সেসব জানার চেষ্টা করি নি , অথবা এই সমাজ সেসব জানতে দেয়নি । ওনাকে ওববাভা হায়দার আলীর সাথে লড়াই করে তার প্রায় একশত সৈন্য একাই হত্যা করেছিলেন । মল্ল যুদ্ধে বহু ভারতীয় মহিলা ভারতীয় মহারাজদের কুপোকাত করেছেন এমন নিদর্শন বহু শিলালেখ থেকে আমরা জানতে পেরে থাকি ।


বর্তমান সভ্যতায় নারীদের অবস্থা

বর্তমানে আমরা উন্নতির দিকে যত এগিয়েছি তত মহিলা সুরক্ষা নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা করছি । তবু প্রশ্ন থেকে যায় আজ সত্যিই মহিলারা সুরক্ষিত তো ? প্রশ্ন থেকেই যায় আজও গভীর রাতে নারীরা পথে ঘাটে নিরাপদ তো ? নারীদের নিরাপত্তা যদি সত্যিই বেড়েছে তবে তাদের  সংরক্ষণের দাবি ওঠে কেন ?  রাজস্থানের এমন একটি জায়গা আছে যেখানে এখনো সহমরন প্রথা চালু আছে । গ্রামের দিকে , নারী জন্ম আজও কতটা অশুচি । আজও মাসিক হলে মেয়েদের পুজোর ঘরে ঢোকা নিষেধ । আর সবশেষে নিজের মাকে প্রশ্ন করে দেখুন বিয়ের মণ্ডপে বাবার পাশে তার বসার অধিকার আছে কি না ?
আসলে ছেলেদের পরিচালিত সমাজ ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী । তারা আসলে যাই করুক তাই ঠিক , মেয়েরা নয় । পুরান থেকে বর্তমান -- এই নিয়মেই বাঁধা । এ নিয়ে একদিন লিখবো । সেদিন হয়তো পুরুষদের চক্ষু শূল হবো । তবু লিখবো । পুরুষ সমাজ যে কত বড় অপরাধী তা না বললে অন্যায় হবে।

ভারতীয় মহিলা শক্তি পৃথিবীর চোখে শক্তির শুধু নয় , মুক্তি দিলে অনায়াসে সব ক্ষেত্রেই বাঁধ ভেঙে দিতে পারে । মহিলাদের মানসিক দক্ষতা তাকে বহু ক্ষেত্রেই এগিয়ে দিয়েছে । কিন্তু ওই যে পুরুষ শাসনের বেড়াজাল । ওই নিয়ম ভেঙে শত শতাংশ নারীমুক্তি সম্ভব হয় না । তবে একটা কথা বলাই যায় সমাজে প্রচলিত কথা , ' ন স্ত্রী স্বতন্ত্রমারহতি ' , বর্তমানে বহুক্ষেত্রেই ভুল প্রমাণিত ।

 সমাজ গঠনের প্রয়োজন মানুষ ঠিক কবে থেকে উপলব্ধি করলো তা বলতে না পারলেও , একটা কথা অনায়াসে বলাই যায় মানুষের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা মানুষকে সমাজ গঠনে বাধ্য করেছিল । এক বিখ্যাত ইংরেজি প্রবাদ অনুযায়ী , " Necessity is the mother of all invention " । সমাজও মানুষের কাছে এমনই এক প্রয়োজনীয় আবিষ্কার ছিল । তবে আজকের সমাজ ব্যবস্থা আর সমাজ ব্যবস্থার প্রথম ধাপটি কিন্তু মোটেই এক ছিল না । জঙ্গলে বসবাসকারি আদিম মানুষগুলো একে অপরের প্রয়োজনে সমাজ গঠন করে , ফলে সেই সমাজে এক সুন্দর সমন্বয় ছিল ; কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে ওঠে , ফলে সমাজের দাঁড়িপাল্লা হয়ে উঠতে শুরু করে একপেশি ।
সমাজ ব্যবস্থার দিকে আলোকপাত করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে সামাজিক বিভেদ শুধু ধর্মের ভিত্তিতে নয় , অর্থের ভিত্তিতে নয় , লিঙ্গের ভিত্তিতেও গড়ে উঠতে থাকে । আর এর মূলে ছিল পুরুষদের অবাধ ক্ষমতা পেয়ে যাওয়া । স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষমতা লোভের জন্ম দেয় এবং পুরুষেরা এই লোভের বশীভূত হয়ে নারীদের উপভোগ্য বস্তু বলে গড়ে তুলতে শুরু করে । নানা অছিলায় গার্গী মৈত্রীদের সমাজে নারীদের বন্দি হতে হয় চার দেওয়ালের মধ্যে । এক একটি দিক বোধহয় আলোচনা করলে বোধহয় ভালো হয় ---

আলোচনা ১ :- দুর্গা , কালি , জগদ্ধাত্রী , লক্ষ্মী , সরস্বতীর উপাসনা করা মানুষেরা কিন্তু ক্ষমতার দিক থেকে তাদের স্থান প্রদান করে নি । ভারতীয় পূরানে বর্ণিত এই মহিলাদের ক্ষমতাশীল হওয়া সত্বেও , স্বর্গ রাজ্যের অধিকার ইন্দ্রের হাতে এবং পৃথিবী পরিচালনা , সৃষ্টি তথা ধ্বংস তিন দেব -- ব্রহ্মহা , বিষ্ণু ও মহেশ্বরের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে । অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও লক্ষ করলেও একই ছবি দেখা যাবে । ইসলাম ধর্ম বোরখার আড়ালে মেয়েদের ক্ষমতা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল । গৌতম বুদ্ধ বিবাহিত হয়েও স্ত্রী কে একা ছেড়ে চলে আসে । খ্রিস্টান ধর্ম নারীদের উন্নতির কথা বললেও প্রধান ক্ষমতা কিন্তু একজন পুরুষদের হাতেই তুলে দিয়েছিল । আর জৈন ধর্ম নারী জন্মকেই পাপ বলে চিহ্নিত করেছিল এ কথা কে না জানে ।
অতএব এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট সামাজিক জীবেদের চিন্তা , ধ্যান , ধারণা আমাদের পুরান তথা ধর্মীয় গ্রন্থে পড়েছিল আর বিভিন্ন ধর্মীয় গুরু সেই ধারণার বীজ যুগ যুগান্তর ধরে আমাদের মধ্যে বপন করে চলে এসেছে ।


আলোচনা ২ :- আর্য সমাজে মেয়েদের এক বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো এ কথাও যেমন ঠিক , তেমনই  নারীদের বেশ্যা রূপটিও যে সমাজের তৈরি তা ভুললেও চলবে না । ইন্দ্র কে ক্ষমতায় আসীন যেমন করা হয়েছে , তেমনই রম্ভা , উর্বর্ষিদের নর্তকি হিসাবে ভারতীয় পুরানেই দেখানো হয়েছে । এই যে আসুরিক প্রবৃত্তি তা দেব , মানব , অসুর সকলের মধ্যেই যে বিরাজ করছে তা এখান থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে । তাদের চোখে নারীরা চিরকাল উপভোগের পণ্য হয়েই থেকে গেছে , একথা কে না বুঝতে পারে বলুন তো ?
অন্যদিকে এই বেশ্যা রূপ পুরুষদের মধ্যেও আদি কাল থেকেই বিরাজ করছে । দুঃখের বিষয় হলো ইতিহাস সে সব কোনদিন প্রকাশ করে না । এই ধরুন না , ছয় পান্ডবের জন্ম কাহিনীটাই । কুন্তীর বিবাহ বহির্ভূত যে সম্পর্ক তার ফলেই কর্ণ সমেত , পাঁচ পান্ডবের জন্ম হয় । কুন্তি সূর্য , বরুণ প্রভৃতি দেবতাদের সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েন এবং প্রেগনেন্ট হয়ে যান । আপনারা এ ক্ষেত্রেও কুন্তীর দোষ খুঁজতে ব্যস্ত নিশ্চই ? অথচ এই দেব গন মহাভারতের পাতায় যে ভূমিকা ছেড়ে গেছেন তা বর্তমান MSW (Male Sex Worker ) দের থেকে কোন কম কি ? অথচ তাদের এই ভূমিকাটি সমাজ খুব সহজেই চেপে দিয়েছেন , যেমন চেপে দেওয়া হল পুরুষ যৌন ক্রিয়া বর্তমান সমাজে । একটা কথা মনে রাখতে হবে , যা খারাপ তা সকলের জন্যই খারাপ হওয়া উচিত । তবে সব খারাপের দায় একলা নারীর হবে কেন ?

আলোচনা ৩ :- আজকে নারীদের প্রতি পুরুষ সমাজের একটু অন্য রকম দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবো । যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মে এই অত্যাচার নারীদের সহ্য করতে হয়েছিল । তার দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমাদের লজ্জিত নয় ব্যথিত হতে হয় । এই পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নারীদের সহজে পদ দেয়নি এটা যেমন ঠিক , তেমনই এই সমাজ নারীদের বারবার অত্যাচারের মুখে ঠেলে দিয়েছে । সীতাকে অগ্নি পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের সতিত্বর পরীক্ষা দিতে হয়েছে , কিন্তু রামকে তা দিতে হয়নি । গভীর জঙ্গলে রাম , লক্ষ্মণ ও সীতা আলাদা হয়ে পড়ার পর ঠিক কি ঘটেছিলো তা আমাদের সামনে সেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় নি । সেক্সের চাহিদা প্রাকৃতিক নিয়মে নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যে হয়ে থাকে । তা পূরণ করতে যদি সীতা উদ্যত হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়ে থাকে , তবে রাম বা লক্ষ্মণকেও এই একই দোষে সন্দেহ করা হবে না কেন বলতে পারেন ?
আলোচনাটিকে আরও একটু মিষ্টি ও গভীর করে তুলতে চলুন একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক । পুরান ও ধর্ম গ্রন্থগুলি যেহেতু আমাদের সমাজের আদী ইতিহাস বলে সমাদৃত হয় তাই এই গ্রন্থের ওপর নির্ভর করেই আমরা পুরুষদের কুকর্মলিপ্ত সমাজকে জানতে ও চিনতে চেষ্টা করবো ।
মুসলিম সমাজে মহিলাদের কতটা সম্মান দেওয়া হয়ে থাকে তা আমরা কম বেশি সকলেই জানি । পর্দা প্রথার নামে মেয়েদের বন্দি করে রাখা হয় । পর পুরুষের দৃষ্টি এড়াতে তাদের বোরখা পড়তে বলা হয় । ওহে মূর্খ , মেয়েদের কত সহজে উপেক্ষা করিস তোরা ! পুরুষের ক্ষেত্রে এমন নিয়ম কেন কার্যকর হবে না বলতে পারেন ? তারাও তাহলে অন্য মেয়েদের দৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারে । নাকি তাদের ক্ষেত্রে সাত খুন মাফ । অবশ্য যে ধর্ম মেয়েদের ঘরে বন্দি করতে চায় , পড়াশুনা করতে মানা করে , সমাজের মূল স্রোতে মিশতে দিতে চায় না তাদের কাছে এসব আসা করাও হাস্যকর । মালালার জীবনী এই বক্তব্যের সমর্থনে সবচেয়ে বড় প্রমান । সত্যি বলতে মুসলিম সমাজ মেয়েদের বাচ্চা উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করে তুলতে চেয়েছে । একের বেশি বিবাহ যা হিন্দু ধর্মেও লক্ষ করা গেছে তা মুসলিম ধর্মেরও প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ফুটে উঠেছে এর জন্মলগ্ন থেকে । আর এই বহু বিবাহের মূল উদ্দেশ্য প্রেম নয় , বরং সন্তান উৎপাদন, এটা বলতে কোন বাঁধা থাকতে পারে না ।  তাজ্জব না । তবে এই রীতি হিন্দু ধর্মেও দেখতে পাবেন । মুসলমান সমাজে মেয়েদের প্রতি অন্যায়ের আরও একটি দিক হলো তিন তালাক প্রথা এবং নিকাহ হালাল । এই প্রথম নিয়ম অনুযায়ী মুসলিম পরিবারে স্বামী নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নিজের স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে এবং তার জন্য কোন কোর্ট বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই তার । তালাক তালাক তালাক বলা হলেই স্বামী স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে দিতে পারেন । উল্টোটি কিন্তু সত্য নয় এক্ষেত্রে অর্থাৎ স্ত্রী স্বামীর ওপর শত অভিযোগ থাকলেও সেই বেচারি স্ত্রীর তালাক দেওয়ার কোনো অধিকার পুরুষ তাদের দেয় নি । এখন যদি সেই স্বামী তালাক দেওয়ার পর নিজের ভুল বুঝতে পারে তবে সমাজ মেয়েটিকে পুনর্বিবাহের যে নিয়ম রেখেছে তা সত্যিই এক অপমানের থেকে কম কিছু নয় ।
হালাল অনুযায়ী মেয়েটিকে অন্য কাউকে বিবাহ করে তালাক প্রাপ্ত হলে তবেই নিজের আগের স্বামীকে বিবাহ করার অধিকার ফেরত পাবে ।

সত্যিই কি বিচিত্র সমাজ সেলুকাস ! সত্যই মেয়েদের প্রতি তার বিচিত্র নিয়ম । অথচ পুরুষ সমাজের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলেও তাদের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম কার্যকর করে নি কেউ । ভাবো পুরুষ ভাবো আর তার পাশাপাশি এই বিস্বাস নিয়ে ভাবনা রেখো , মেয়েরা তোমাদের হাতের পুতুল নয় । অবশ্য এই অংশে মুসলমান সমাজকে তুলে ধরেছি শুধু । তবে বাকি সমাজের গভীরে ঢুকতে দিন । দেখবেন পুরুষতন্ত্রের এই আঁতুরঘর নারীদের কিভাবে বঞ্চিত রেখেছে , উপেক্ষিত করে এসেছে চিরটাকাল । বর্তমান সমাজেও এর পরিবর্তন হয় নি এক আনাও ।

বর্তমান বিশ্ব সমাজ গঠনের অন্যতম উপাদান হলো জৈন সমাজ । এই সমাজে নারীদের উপেক্ষা সর্বাধিক লক্ষণীয় । জৈন দের বিস্বাস অনুযায়ী মহিলা জন্ম পাপ ও অশুচি ময় । তাই তো স্বেতামবর রা মহিলাদের আশ্রমে প্রবেশ করতে দিত না । জৈন ধর্মগুরু মহাবীরের মত অনুযায়ী , "Women are the greatest temptation in the world. . . He should not speak of women, nor look at them, nor converse with them, nor claim them as his own, nor do their work" (Sacred Bookds of the East, vol. 22:48). ভাবুন তো কি সাংঘাতিক এই নীতি । আর আরও ভেবে দেখুন এই নীতি কার সৃষ্টি -- একজন পুরুষের । আচ্ছা ইনি সমাজ ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ করার কে ? যে ব্যক্তি পুরুষদের আপন করে নিতে পারেন , পুরুষদের কাছে টেনে নিতে পারেন অথচ এই সৃষ্টির সৃষ্টি যার দ্বারা ; তাকে সম্মান করতে পারেন না ; তিনি সমাজের নিয়ম নির্ধারণ করার অধিকারী হন কি করে ?

মহাবীরের কাছে মহিলারা নাকি সমস্ত পাপের উৎস । আর এ কথা তিনি নিজেই বলে গেছেন ; "He, Mahavira, to whom women were known as the causes of all sinful acts, . . . (ibid., vol. 22:81).

পুরুষদের এমন কুটিল নীতি দ্বারা মেয়েরা বারবার এভাবেই আঘাত পেয়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে । আরও অনেক ব্যাখ্যা করা বাকি থেকে গেছে যা আগামীর আলোচনায় তুলে ধরে দেখাবো যে পুরুষ ও পুরুষ সৃষ্ট সমাজের নিয়ম কতটা একচোখা । নারী প্রগতি নিয়ে সমাজের গোড়ায় অথবা ধর্মের পুঁথিতে হাজার হাজার গুঞ্জন শোনা গেলেও , বাস্তবে তারা নারীদের বন্দি করতে চেয়েছে নিজের মুঠোতে ।
এই তো আমাদের দোরোখা সমাজ যেখানে মেয়েদের জন্য বাল্য বিবাহ , সহ মরন , একাদশী , হালালা , তিন তালাক এর মত ঘৃণ্য নীতি প্রচলিত । আবার সেই মেয়েকেই এই সমাজ কি সুন্দর পুজো করে কুমারি হিসাবে ।
বিদ্যাসাগর , রামমোহনের মত কিছু পুরুষ মেয়েদের জন্য এগিয়ে এলেও অধিকাংশরাই নীরব । জানিনা তারা ভুলে যায় কেন --- ".... ওই কোমল স্তনের দুগ্ধ হতেই এই পুরুষ জাতির জন্ম " ।

প্রাচীন আদিবাসী সমাজে মহিলাদের স্থান

পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় পরিবার বলতে শুধু স্বামী , স্ত্রী ও সন্তান বোঝায় না । যুক্ত পারিবারিক নীতি মেনে বাউড়ি সমাজ আজও জীবিত আছে । এ সমাজে বাড়ির ছেলে মেয়েদের সন্তান সন্ততিরাও একই ছাদের নিচে বাস করে থাকে । ঘরজামাই হওয়া বাউড়িদের মধ্যে সাধারণ হলেও , বাবার সম্পত্তির ওপর মেয়ের কোন অধিকার নেই এ সমাজে । পৈতৃক সম্পত্তির একমাত্র অংশীদার বংশের ছেলে অথবা ছেলেরা ।
বিবাহের ক্ষেত্রে দেনা পাওনার রীতি এ সমাজে বর্তমান । সম্বন্ধ করানোর ক্ষেত্রে ঘটক এর উপস্থিতি লক্ষ করা যায় । প্রেম বিবাহ , আসুরিক বিবাহ , অথবা বউ বদলের প্রবণতাও এদের বিবাহের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য । তবে রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ এই সমাজে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ । তবে বিবাহের ক্ষেত্রে জাত ও গোত্র বিচার অবশ্যই করে নেওয়া হয় । মানব বিজ্ঞানী দত্তের অনুসন্ধান অনুযায়ী বাউড়িদের মধ্যে কিছু টোটেমিক গোত্রের উপস্থিতি ছিল , যেমন -- কুকুর , শাল , কচ্ছপ , নাগ প্রভৃতি । কুকুর গোত্র পশ্চিমবঙ্গীয় বাউড়িদের মধ্যে লক্ষ করা গেছে । প্রাচীন বাউড়ি সমাজে বহুবিবাহের প্রচলন লক্ষ করা গেছে তথা কম বয়সে বিবাহের প্রচলন প্রচন্ড ভাবে দেখা যেত বলেই জানা যায় । সাধারনত একজন বিবাহযোগ্য ছেলের বয়স ছিল ১০-২৫ এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৫-১৫ বছর । এছাড়াও বাউড়ি সমাজের বিবাহ ও অন্যান্য পারিবারিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিশ্লেষণ করলে কিছু তথ্য নজর কেড়ে নেয় আমাদের ---

১. কোন রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ প্রয়োজন হতো না ।
২. দেনাপাওনা তাদের বিবাহের একটি অঙ্গ ছিল ।
৩. সহমরন প্রথা তাদের সমাজে ছিল না ।
৪. স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা বিবাহের প্রচলন এ সমাজে বহুদিন ধরেই বিরাজমান ।
৫. বাউড়িদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা লক্ষ করা গেলেও , স্বামী স্ত্রী কে কোন প্রকার খোরপোষ দিতে বাধ্য নয় ।
৬. বিধবা বিবাহ করলে বা বিচ্ছেদের পর স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়ে করলে তাকে সাঙ্গা বলা হয় ।
৭. সমাজে পুরুষদের পাশাপাশি স্ত্রীর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লক্ষ করা যায় ।
৮. নিজের পছন্দের ছেলে বা মেয়ে না পেলে তারা বিবাহ করতে বাধ্য নয় ।
৯. স্ত্রী কে স্বামীর ঘর চালানোর জন্য সম্পূর্ণভাবে এই সমাজ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে থাকে ।
১০. অন্নপ্রাশন এর ব্যবস্থা থাকলেও সেখানেও ব্রাম্ভন এর কোন ভূমিকা থাকতো না ।
এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে বাউড়ি সমাজের প্রতি এক অন্য সম্মান মনের গভীরে অবশ্যই জেগে ওঠে । ভেবে দেখুন তো নারী স্বাধীনতার জন্য আমাদের সভ্য সমাজে কত আন্দোলন হয়ে গেছে এবং আজও হয়ে চলেছে । অথচ এ দেশের প্রকৃত বাসিন্দা যে আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হয়েও নারীদের কত স্বাধীনতা দিয়েছে । এর পরেও কি লজ্জা হবে না নিজেদের ওপর , বলুন ?

বর্তমান সমাজে মহিলাদের অবস্থান

বর্তমান সমাজে নারী পুরুষ সমান সমান বলে শুনে আসছি আমরা । নারীদের জন্য আইন , সংরক্ষণ প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হয়েছে সরকার দ্বারা । তবু , সমাজের মনোভাবের গভীরে গেলে কিছু জিনিস মনকে বড্ড নাড়া দেয় ।

কয়েকটি প্রশ্ন রাখছি তার ভিত্তিতে ---

১. রাধাকে কলঙ্কিনী বলা হয় -- কারন তিনি বিবাহিতা হয়েও পরপুরুষের সাথে প্রেম করেছিলেন । আচ্ছা প্রেমের কি কোন বাঁধন থাকতে পারে ?
যদি পারে বলুন দেখি  , তবে কৃষ্ণ কি স্বভাব দোষে দুষ্ট নয় ? শুধু পুরুষ ক্ষমতাশালী হওয়ায় তাকে কলঙ্ক পুরুষ বলা হয় না । আর হিসাব করে দেখুন , পুরুষতন্ত্রের নাম করে পুরুষরা ভালোবাসাকে নিজের মনের মত গড়ে নিয়েছেন যা কোনদিন সম্ভব নয় ।

২. আইন প্রণয়ন করলেই কি সমাজ মনে প্রানে সব মেনে নিয়েছে ? কোনদিন নয় । তাহলে নারীদের ওপর এত ধর্ষণ হতো না কোনদিন ।

৩. যতই চ্যাচান , নারী পুরুষ আজও সমান সমান নয় । বিশ্বাস হয় না । নিজের বিয়ের মঞ্চে বাবার জায়গায় মাকে বসিয়ে দেখুন । সব উত্তর পেয়ে যাবেন ।




Tuesday, 10 March 2020

বিক্রি হয় নি যে লেখাগুলো



১।।
আমি কবিতা লিখি না আজকাল । পথের ধারে ফুটপাথ কাঁপছে দেশজুড়ে । কোনদিন ভোরের আকাশ প্লাবিত হবে লাল রক্তে । সূর্য ঘুমিয়ে পড়বে গ্রহণের নামে । 
ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার তাড়া । বাড়িটা ভিড়ের মধ্যিখানে বসে আছে । এক এক করে দখল করে নেবে পুরো মানুষটাকে । চিৎকার করে লাভ নেই কোন । দাম দেয় না কেউ । দাম শুধু শরীরের । 
কবিতা লিখতে বসলেই বৃষ্টি নামে । ছুটে যাই মাঝরাস্তায় অন্ধকারে মোমবাতি নিয়ে । ভিড় জমে আছে ওখানেও । মানুষের ভিড় , টাটকা । ওরাও কাল লাশ হবে অন্যের দাবিতে , যারা ওদের লাশ বানাতে পথে নেমেছিল লাখো লাখো বৃষ্টি ফোঁটা উপেক্ষা করে । 
তেলের দাম বাড়লে কলম তুলি । পরেরদিন কাগজে ছেপে আসে লেখাটি । অনেক লেখার ভিড়ে দাঁড়িয়ে বুঝেছিল কবিতাটি , তার সৃষ্টি মানুষের খরচ কমাতে আর ওরা কলম তুলেছে লেখা প্রতি খরচ কমাতে । 
আমি কবিতা লিখি না , গল্প লিখি না আজকাল । বরং লেখা হয়ে ওঠার চেষ্টা করি । লেখক ছবি হয়ে যাবে নিশ্চিত , শুধু লেখা অমর আদী অনন্ত জুড়ে । 



২।।

যোগ্যরা সম্মান পায় 
আমার সে যোগ্যতা কোথায় 
মাটির চারাগাছটা মুখ বাড়িয়েছিল মাটি থেকে 
আবার মাটির ঘরে ফিরে যেতে হবে তাকে হতাশ
উৎসব শেষ হলে ।

আমি জানি না 
কেন বৃষ্টি নামে আমার ছাদে 
কেন অন্ধকার আমার মন 
আমি একাকী নৌকার পাল তুলে দেবো ঠিক 
আগুন আকাশে ভাসিয়ে দিয়ে শব ।

সেদিন বুঝবে ভালোবাসা , বুঝবে কি হারালে তোমরা 
সেদিন বন্ধ দরজা খুলে দেবে হয়তো , উৎসব করে আমায় 
তবু বনজর নদীর স্রোতে পলি কত হারিয়ে যায় 
কত জীবন রবি হতে পারে না এখানে , বেজ হয়ে কতজন আর অমর হয়ে রয়ে যায় !!

আমি প্রেমহীনা , উদ্বাস্তু তাই ঘৃণা করেছ এই সত্যকে 
একদিন দেখো শিল্পীরা মুছে যাবে সবাই , আমি শিল্প হয়ে বেঁচে থাকবো ঠিক ----

সেদিন আমায় তেল দিও না , কলকব্জা রক্ষনাবেক্ষনে ।