Friday, 19 June 2020

রেল কলোনির আড্ডা ( পর্ব ২)

ওভালের সাথে জড়িয়ে আছে আমার ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি । ১৫ই আগস্টের আগে বৃষ্টি হওয়া যেন প্রকৃতির থেকে পূর্ব নির্ধারিত ছিল আর তার ফলে পরের দিন মাঠের কাদা ঢেকে ফেলতে লাল পাথর গুঁড়ো কি করে ভোলা যায় । সাদা জামা প্যান্ট এর অবস্থা যে কি হতো তা একমাত্র চিত্তরঞ্জন বাসীরাই জানে । এদিকে কাক ভোরে স্কুল থেকে হাঁটা পথে ওভাল যাত্রা শুরু হত । তারপর সেখানে এটেন্ডেন্স নেওয়া হতো । কিছু কিছু বিচ্ছু ছেলে অবিশ্যি আগে ভাগেই মাঠে পৌঁছে যেত এবং সুযোগ বুঝে নিজের স্কুলের দলে এসে মিশে যেত । কারুর চেনবার বা ধরবার জো ছিল না । 


এই একই ঘটনা দেখা যেত ২৬সে জানুয়ারি । ফ্ল্যাগ হোস্টিং , জি এম এর ভাষণ , মার্চ পাস্ট , মাস ড্রিল , ইন্টারস্কুল স্পোর্টস এ সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত ওভালের ওই গোলাকারের মধ্যে । এছাড়া বাবার মুখে শুনতাম কোন এক সময় ওভালের এই মাঠে এককালে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রাদল আসতো । আর সত্যি বলতে চিত্তরঞ্জন চিরকালই শিল্পীদের মাতৃস্থান হয়ে থেকে গেছে । অগুনতি শিল্পী এই চিত্তরঞ্জনে জন্মেছে , বড় হয়েছে ; আবার অনেক শিল্পী কর্মসূত্র ধরে একসময় এসেছিল এই রেলশহরে । ভাবা যায় ওভালের ওই পরিধির মধ্যে আশা ভোঁসলে , রাহুল দেব বর্মনের মত নামি শিল্পীরাও অনুষ্ঠান করে গেছেন । সত্যিই এই শহরের বহুমুখী দিক আকৃষ্ট করে যতবার তার দিকে ফিরে তাকাই । তবু চিত্তরঞ্জন সব সময় একটাই মন্ত্র শিখিয়েছে সবাইকে , দূরে যাওয়ার মন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে  , নিজের পায়ে দাঁড়াতে । রেল ইঞ্জিনের এই শহর তাই তো রেল সুবিধা দিয়ে গেছে আমাদের বারবার যাতে যাতায়াতের সমস্যা না হয় । উন্নতির দিকে যাত্রা , প্রগতির দিকে যাত্রা । আর যাত্রা বললাম যখন তখন শ্রীলতার মাঠ কি ভোলা যায় । রাত জেগে যাত্রা দেখার সুযোগ আমার আজও হয় নি কিন্তু বড়দের মুখ থেকে শুনেছি , কত নামি দামি শিল্পীরা ছুটে এসেছে চিত্তরঞ্জনে শো করতে । তাদের মধ্যে কিছু নাম বলছি , কুমার শানু , নচিকেতা , রবি ঘোষ , পি সি সরকার প্রভৃতি ; কারন সব নাম নিলে চিত্তরঞ্জন ভরে যাবে তবু নাম শেষ হবে না । ওভালের পাশেই  চিত্তরঞ্জন গেস্ট হাউস ও তার সামনে অবস্থিত শিশু বিহার স্কুল । এই ৬৩ নম্বর রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেও ১ নম্বর গেটে পৌঁছানো যায় । সেক্ষেত্রে পথে দেখার মত দাঁড়িয়ে সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট স্কুল । এই ১ নম্বর গেটে যাওয়ার আরো দুটি রাস্তা আছে যার একটি অফিসার কলোনি বা সানসেট এভিনিউ আর একটি ম্যানগ্রোভ এভিনিউ বা মূল বাস রাস্তা । সে দুটি সম্বন্ধে পরে বলবো একদিন । 


ম্যানগ্রোভ এভিনিউ আর গণপতি এভিনিউ একই রাস্তার দুটো নাম । গণপতি হাট সংলগ্ন রাস্তার নাম গণপতি এভিনিউ আর ১ নম্বর গেট থেকে ওভাল অবধি এই রাস্তার নাম ম্যানগ্রোভ এভিনিউ । ওভালের ঠিক উল্টো দিকে এস পি ইস্ট বাজার আর বাজারের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রঞ্জন সিনেমা ও বাসন্তী ইনস্টিটিউট । রঞ্জন সিনেমাটি বর্তমানে আধুনিকতার ছাপ লাগলেও , পুরোনো হলে বাবার হাত ধরে দেখা ইংরেজি সিনেমা দেখার মজা আজও মনে লেগে আছে । তখন হলটিতে নতুন সিনেমা লাগতো না । রিলিজ হয়ে যাওয়া সিনেমা অনেক হাত ঘুরে এসে পৌছাত হলের পর্দায় । তবু লোকের আগ্রহ কোন ভাবেই কম ছিল না । তাছাড়া রঞ্জনে মাঝে মাঝে জলসার আসর বসতো । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর মত নামি শিল্পীও এই রঞ্জনে জলসা করে গেছেন । এস পি ইস্ট মার্কেট থেকে বাস রাস্তা ধরে গণপতি এভিনিউ ধরে হাঁটলে পৌঁছে যাওয়া যায় এরিয়া ২ ডিস্পেন্সারি র সামনে । এই ডিস্পেন্সারির ঠিক পাশেই এক কালে মহিলা মহলের দুর্গাপুজো হতো । এই পুজোর বৈশিষ্ঠ ছিল সম্পূর্ণ পুজোটি মহিলা দ্বারা পরিচালিত ছিল এবং পুজো কমিটিতে কোন পুরুষ সদস্য ছিল না । বেশ কিছু বছর পুজো হওয়ার পর পুজোটি অবশেষে বন্ধ হয়ে যায় । তবে এর স্মৃতি আমার মনে আজীবন জ্বলজ্বল করবে । 


এই পথ ধরে আর একটু এগিয়ে গেলেই এস পি নর্থ মার্কেট । এই বাজার এর বেশ কিছু স্মৃতি পরের পর্বে আলোচনা করবো , কেমন ।
নর্থের বাজারে ঢুকেই পড়লাম যখন তখন আজ আর কোন কথা বলবো না । বরং একটা কবিতা হয়ে যাক আজ । আরে আরে মুখ ভার করলে চলবে ? চিত্তরঞ্জনে এলে আড্ডা না দিয়েই চলে যাবে ? চিত্তরঞ্জন মানেই তো আড্ডার শহর । চিত্তরঞ্জন মানেই তো হুল্লোড়ের শহর । শীতের সন্ধ্যে বেলা সকলে গোল করে বসে আগুন সেঁকা আর গরমে ঘরে কে ঢুকবে ? ভেতরটা ভ্যাপসা । পাপাই , বুকু , মিঠু , ফুচান , আমি , পুকান , পোষন সবাই বোস আজ । আড্ডা দেবো জমিয়ে । সামনে না পারি এই বইয়ের পাতায় সকল চিত্তরঞ্জন বাসীর মহা আড্ডা । সবার আমন্ত্রণ কেন ? কারন এ শহর ভেদাভেদ জানে না তাই । কবিতাটা আমার সাথে বলো , পুরোনো প্রেমিকার কথা মনে পড়ে যাবে । পুরোনো প্রেমিকাটা কে ভাবছো তো ? দুর্গা পূজার এই নর্থের বাগানেই একটা ঝালমুড়ি খাইয়ে চারদিন চুটিয়ে গল্প করেছিলে যার সাথে ভলেন্টিয়ারের বেঞ্চে বসে বসে । তার কথায় বলছি গো । এবার আসর শুরু করি তাহলে আজকে ?  


নর্থ মানেই রাত জাগা আড্ডার মহড়া 
নর্থ মানেই চা সিগারেট , মিষ্টি আর সিঙ্গারা 
নর্থ মানেই মন্টু ঘোষ 
নর্থ মানেই ডালপুরি , রসগোল্লা 
নর্থ মানেই অজানতিক ফুটবল 
আর স্কাউটে র ছেলে ছোকরা ।
নর্থ মানেই দুর্গা পুজো - প্রস্তুতি থেকে বিসর্জন 
নর্থ মানেই বিশাল ঠাকুর - মেলায় বসে বসে 
ভাজা সেই বাদাম ভোজন ।
নর্থ মানে বন্ধু হয়ে যাওয়া মুহূর্ত 
নর্থ মানে পাশের বাড়ির খবর রাখা 
নর্থ মানেই দেওয়ালির খুব ভোরে 
ক্যান হাতে মণ্ডপে মণ্ডপে ভোগ আনা ।
নর্থ মানে দোল খ্যালে - হিন্দু থেকে মুসলমান 
নর্থ মানে ঈদের সিমুই , বড়দিনের কেক 
আর একটা পুরোনো নেশা , নতুন বোতলে সিল করা ।


সুন্দর পাহাড়ি নর্থ বাজারে ঢুকেই পড়েছি যখন তখন একজনের নাম না বললে ভীষন অন্যায় হবে । তিনি হলেন মন্টু ঘোষ । মিষ্টির জগতে এক উল্লেখযোগ্য নাম এই মন্টু ঘোষ । তবে তার থেকেও উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় তার কর্ম উদ্যম মানসিকতা । সকাল থেকে রাত অবধি দোকান ও রান্না হওয়া মিষ্টি তৈরির প্রবল তত্ত্বাবধান তার সফলতার মূল মন্ত্র ছিল । ধীরে ধীরে ওই স্থান মানুষের মিলনস্থলে পরিনত হয়ে ওঠে । একসময় চিত্তরঞ্জনে চাকরি নিয়ে এসেছিলেন খরাজ মুখার্জীর মতো অনেকেই । সন্ধ্যে বেলা ওই দোকানের সামনের ফাঁকা জায়গায় সময় কাটিয়ে গেছেন তাদের মত নামি দামি ব্যক্তিরাও । যারা এখনো এ দোকানে যান নি তাদের জন্য বলে রাখি  "কালাকাঁদ 'আর "ভাপা' সন্দেশ এর সাথে মন্টু ঘোষের নাম মিষ্টির ইতিহাসে প্রচণ্ড ভাবে জড়িত । 


এছাড়া নর্থের দুর্গা পুজোর একটা ইতিহাস আছে । পুজোর সময়ে নানা মানুষ ও নানা দোকানের সমাহারে জায়গাটি হয়ে ওঠে বহু মানুষের মিলন ক্ষেত্র । পাশাপাশি পুজোর ঐতিহ্য স্থানটিকে করে তোলে চিত্তরঞ্জনের ম্যাডক্স । তবে শুধু নর্থের দুর্গাপুজো নয় , অন্যান্য অঞ্চলের পূজগুলিও যে কোন এলাকাকে টেক্কা দিতে পারে এ ক্ষেত্রে । সেসব পুজো নিয়ে একটা গোটা পর্বে আলোচনা করবো । এখন আপাতত এগিয়ে চলি । 


নর্থের প্রতিবেশী বলতেই যে অঞ্চলের নাম মানুষের মুখে উঠে আসে সেটি হলো সিমজুরি । বাজার ছেড়ে বড় বাস রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই চার মাথার মোড় । বাদিকে কুশবেদিয়া যাওয়ার উন্মুক্ত পথ আর ডান দিকে ফতেপুর যাওয়ার রাস্তা । সিমজুরির প্রবেশ দ্বার এখান থেকেই শুরু । 
সিমজুরি নিয়ে বলতে পারা , লিখতে পারা এ নেহাতই দুঃসাহস আমার কাছে , কারন এত ইতিহাসময় আমাদের চিত্তরঞ্জন শহরটি যে প্রথম দিকের শহরের বর্ণনার জন্য আমাকে বিভিন্ন জনের অভিজ্ঞতা তুলে নিতে হয়েছে । ১৯৪৩ সালে সিমজুরি ছিল সাঁওতাল সম্প্রদায়ভুক্ত একটি গ্রাম । অজয় নদের পাশে অবস্থিত এই গ্রামটি কোনদিন চিত্তরঞ্জন ভুক্ত হবে একথা তখন কেউ কোনদিন ভাবতেও পারে নি । 


১৯৫০ সালে সিমজুরি অন্তর্ভুক্ত হলো পশ্চিমবঙ্গে, অন্তর্ভুক্ত হলো চিত্তরঞ্জন নামক এক রেল নগরীতে । নগরায়নের ছাপ লাগলো আদিবাসী এই অঞ্চলের বুকে । জীবনযাত্রা পরিবর্তন হতে শুরু করলো সিমজুরি , ফতেপুরের মতো এলাকাগুলো । শুধু কিছু চিহ্ন ভগ্ন রুগ্ন দশায় দাঁড়িয়ে রইল সভ্যতার মধ্যেও , ঠিক যেমন ৮৮ নং রাস্তায় গেলে সিমজুরির সেই কেল্লা আজও দেখা যায়। 



( চলবে )

No comments:

Post a Comment