Tuesday, 23 June 2020

আমি বিদ্রোহী





উৎসর্গ : প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম 



১।।


আমি বিদ্রোহী



আমি বিদ্রোহী , 



অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করি নি কোনদিন । মানুষ যেখানে বঞ্চিত , উপেক্ষিত ; যেখানে যখন লাঞ্ছিত এ যুগের নারায়ণ , আমি তখন কলম হাতে পথে নেমেছি 

আক্রমণের ধারে বিদ্ধ করেছি দারিদ্র , অসহায়তা , অপরাধ । আমি জানি আজ মানুষের মনে লোভ অসীম আর তাই তো বারবার কবিতায় আমার ফুটে উঠেছে চাহিদা লোভহীন । আমি তোমাদের হতে চেয়েছি , জানিনা কতটা পেরেছি । তবু বারবার অহংকার করে বলেছি এক সীমাহীন পৃথিবীর গল্প ।

আমি বিদ্রোহী 



জীবনে যা কিছু অশুভ , যা কিছু অপ্রিয় আমি বারবার , প্রতিবার তারই বিরুদ্ধে লিখে গেছি । কলম , আমার কাছে একটি অস্ত্র এবং সেই অস্ত্রের ছোঁয়ায় লাল ওই আকাশের লালিমাটিকে মুছে দিয়ে নীলাকার রূপে আবার রঙ ভরেছি ।



আমি বিদ্রোহী , 



বন্ধুগন , আমি বিদ্রোহ করেছি এই সমাজের গলদের বিরুদ্ধে , সমাজ গড়বো বলে । তবে , নেতা হয়ে নয় , একজন সামন্ত হয়েই আমার আগ্রাসন । কবিতা কে ভালোবেসে , ঈশ্বরকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলেছি নীরবে । আমি কবি হতে আসিনি , কবিতা বিলিয়ে দিতে এসেছিলাম । প্রেমিক হতে আসিনি , প্রেমিকার জীবনের অংশ হতে এসেছিলাম । কিন্তু এই পৃথিবী পাঠক দিলো না , প্রেমিকা আশ্রয় দিল না মনে । এতটুকু অনুরোধ কেউ প্রতিবাদী নেতা বানিয়ে দেবেন না ।



ভালো থাকুক নক্ষত্রপুঞ্জ , ভালো থাকুক নতুন গ্যালাক্সি 

শুধু দয়া করো পৃথিবী ,আমার নিঃশব্দ সৃষ্টিগুলো 
নীরব রেখো , আমি নীরব হয়ে যাবার পরে 



২।।



আমি বিদ্রোহী 



বিদ্রোহ করেছি নিজের বিরুদ্ধে

বিদ্রোহ করেছি নিজের বস্তা পচা আদর্শের বিরুদ্ধে 
বিদ্রোহ করেছি এমন হাজার হাজার 
নীতির বিরুদ্ধে যা এতদিন ধরে জন্ম দিয়েছে 
এক পঙ্গু সমাজ , পঙ্গু সংস্কৃতির ।



আমি বিদ্রোহী 



হাজার হাজার অভিশাপ তাই আমার মাথায় 

সিঁদুর হয়ে জড়িয়ে থাকে 
সত্যি , সমাজের কাছে বরাবরই দায় 
অসহায় করে দেয় যে অসহ্য দাওয়াই ।



বন্ধুগন , আমি জানি 

এই সমাজ আমাকে নাম দেবে না , 
সম্মান দেবে না
কোন মনে আমি আশ্রয় পাবো না 
হৃদয়ের ভালোবাসা পাবো না 
সবাই আঙ্গুল তুলবে আর চিৎকার করে 
আমায় পাগলের শ্রেণীতে স্থান দেবে --- 



কারন 



তারাও ভীত আমার এই সামন্তী আগ্রাসনে । 

তাই আমি বিদ্রোহী , কলম আমার অস্ত্র 
স্বপ্ন ভালোবাসাময় সংসার ।



আমি বিদ্রোহী ছিলাম না । কিন্তু এই সমাজ আমায় হত্যা করেছে বারবার । ভালোবাসায় মুখ লুকিয়েছিলাম ,

ভালোবাসা আমায় পরিত্যাগ করেছে । 
অনেক দুঃখ সয়ে গেছি , আর তারপর অবশেষে 
বিদ্রোহ করেছি । 



বন্ধুগন , 



আমি আগেও বলেছি 

আমি প্রেমিক হতে এসেছিলাম , কিন্তু 
এই নির্দয় সমাজ 
আমায় প্রেম দেয়নি । তাই কলমের ধারে 
রক্তকনা পান করছি আমি । 



চাইলে আমায় শুলে দিও , অথবা 

হত্যা করো এই সময়ে । 
আমি বদলের স্বাদ চেখেছি , 
নিজেকে বদলের ধাঁচে মেলে ধরেছি 



তারপর 

যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ....



ফিরে আসি অথবা নাই আসি 

মনে রেখো 



আমি বিদ্রোহী নই 

ভালোবেসে তাকে আমি অপরাধী একজন ।




৩।।

আমি বিদ্রোহী 



বিদ্রোহ করেছি সমাজের সেই জীর্ণ পচা আদর্শের বিরুদ্ধে , যেখানে একজন নারীকে ওরা বিদায়ের নামে ঠেলে ফেলে দেয় নোংরা জলের গভীরে । আচ্ছা , এই নারী মূর্তি ঘিরে কাল কত উন্মাদনা ছিল । কত নিষ্ঠা ছিল । কত আনন্দ ছিল । কারন , এই নারী একটি লাল সুতোর গেরোয় এতদিন বন্দি ছিল তোমাদের প্রাসাদে ।

বিদায়ের দিনে গেরো গেছে ছিঁড়ে , এবার তার মুক্তির সময় , স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে সে । তাই সমাজ তাকে তুলে ফেলে দিল গঙ্গার গভীরে ।



আমি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি । 



নারী মানে আমার চোখে দেবী নয় শুধু , নারী মানে আমার চোখে মা , কন্যা , বোন , স্ত্রী , প্রেমিকা । আমার কাছে তাদের সম্পর্ক ভালোবাসার আর এই ভালোবাসার টানে আমি হেঁটে চলেছি অনন্ত পথ এই জীবনে । ভালোবাসা আমায় ত্যাগ করেনি , আমি বুঝেছি । শুধু একজনকে ঘিরে এ সংসার নয় । এই দেশ, এই সমাজ আমার চোখে এক একজন প্রেমিকা । 



আজ জলাশয়ের ওপর আলো পড়েছে অনেক । সেই আলো সমাজকে কবে আলোকিত করবে ঈশ্বর জানেন । 

কবে প্রেম ধরা দেবে মানুষে মানুষে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে ঈশ্বর জানেন । 



আমি বিদ্রোহ করেছি । সেই প্রেম প্রতিষ্ঠার জন্য আমি বারবার বিদ্রোহ করেছি ।



তাই আমি বিদ্রোহী । প্রেমিক বিদ্রোহী ।




৪।।



আমি বিদ্রোহী ।



বিদ্রোহ করতে আমি রণে নেমেছি । দারিদ্র দূরীকরণের নামে 

আমি দরিদ্রকে মিটে যেতে দেখেছি । আমি দেখেছি স্তন কাটা মায়েদের কান্না , 
আমি দেখেছি আড়াই থেকে সত্তরের ধর্ষণ হওয়া শত শত কন্যা । 
আমি দেখেছি উর্ধিধারীর দল , মিশে গেছে ঘুষের রঙে 
আমি দেখেছি এসি ঘরে জামাই আদর , চালায় নেতারা নিজেদের ওই কেতাবি ঢঙে ।



আমার কলম নিস্তেজ হয়েছে এ হিম শীতলতায় । 

তবু গর্জে উঠেছে 
যেখানে পেয়েছে রক্ত গরম করা অন্যায় আগুনের উত্তাপ ।
বন্ধুগন , 
তোমরা আমার বীর সৈন্যদল । তোমাদের একহাতে মনুষত্ব 
আর 
অন্যহাতে ধ্বংসরূপে ধর্মের অবস্থান ।
একহাতে তোমাদের প্রেম , ভালোবাসা 
আর 
অন্যদিকে হিংসার দাবানল ।
একদিকে তোমরা প্রেমিক শিশু 
অন্যদিকে নৃশংস আদিম পশু ।
যেদিন এই বাঁশির সুর থেমে যাবে , সূর্য আমার পশ্চিমে 
ঘুমিয়ে পড়বে 
সেদিন নবীর হাতে আমি কৃষ্ণের প্রেমের বাঁশি দেখতে চাই! 
সেদিন কৃষ্ণের কণ্ঠে আমি মোহাম্মাদের বাণী শুনতে চাই ।
মানবতার ধর্মের ডাকে , একসাথে লড়তে চাই শুধু।



সেদিন কবরে ঘুমিয়ে অথবা চিতায় শুয়ে 

আমি নিজে নিজেকে বলতে পারবো 
আমি বিদ্রোহী নই । একজন সফল প্রেমিক ।
সেদিন নিজে নিজেকে একটা উপহার ছেড়ে যেতে পারবো 
আমার ভালোবাসার জন্য , একটা সমাজ ।




৫।।

আমি বিদ্রোহী ।



ধর্মের নামে গোঁড়ামি যত দেখেছি 

ততই আমি দৃঢ় কণ্ঠে রুদ্ধ কলমের খোঁচায় 
প্রতিবাদ করেছি 
বলেছি সত্য , গেয়ে উঠেছি মানবের জয়গান ।
কিছু নিচ পাষন্ড আজও মতি ভুলে 
মানুষকে উপেক্ষা করে 
ধর্মের নামে বিভেদের খেলা খেলে ।



আমি বিদ্রোহ করেছি 

সেই ধর্ম , সেই চির প্রচলিত জীর্ণ 
পন্ডিত থেকে পুরোহিত ,
হিন্দু , মুসলমান , জৈন অথবা ক্রিস্টান 
বেদের শ্লোক থেকে আয়াত - এ - কুরআন ।



আমি বিদ্রোহী ।



বিদ্রোহ আমার রক্তে , যেখানে উপেক্ষিত মানুষ 

বিদ্রোহ আমার শর্তে , চাই মানুষের দেবত্বের অধিকার ।
আমি নানক পড়েছি , আমি পড়েছি বেদ কোরান বাইবেল 
অথবা ত্রিপিটক 
আমি বৌদ্ধ শুনেছি , শুনেছি কবিরের দোহা 
কিংবা 
লালন শাহের মানবিকতার গান ।



আমি ভক্তি দিয়ে সব মেনেছি 

যুক্তি দিয়ে সব পুঁথি ঘেঁটেছি 
গেছি মক্কা থেকে লুম্বিনী নগরে 
কৈলাশ থেকে জেরুজালেম 
আর তারপর 
সকলের জন্য লিখতে বসেছে 
বিদ্রোহী মন আমার 
মানবিকতার গূঢ় তত্ব ---
" সবার উপরে মানুষ সত্য , তাহার উপরে নাই " 



৬।।



আমি বিদ্রোহী ।



মন্দিরের বন্ধ ঘরে যে লক্ষ্মী ধর্ষণ হল কোজাগরীতে 

মসজিদের দালান জুড়ে যে পথিক ঝিমিয়ে ঘুমায় 
ক্ষুধায় মরে 
আমি তাদের জন্য ভগবানের ঠিকানা খুঁজেছি 
মানুষের দরবারে 
নেমে গেছি পথের ধুলায় , মানুষের গান বুকে জড়িয়ে 
বলেছি দৃঢ় কণ্ঠে ভাঙতে ওই পাথরের ইমারত 
যেখানে মূর্তি আছে সাজানো সারি সারি 
যেখানে কনায় কনায় ভরে আছে কুরানের পবিত্র বাণী 



আমি বিদ্রোহী 

ধর্মের জন্য বিদ্রোহ করেছি বারবার 
আমার লক্ষ্য শুধু একটাই ধর্ম প্রতিষ্ঠার 



আমি বিদ্রোহী 

জ্বলে উঠবো বারবার 
করেছি আর করবো বিদ্রোহ মানুষের জন্য 
হিন্দু , মুসলিম , ক্রিস্টান , জৈন , বৌদ্ধ , শিখ , পারসিক সব 
নিপাত যাক 
পৃথিবী জুড়ে শান্তি নামুক মানবিকতায় ।




৭।।



আমি বিদ্রোহী ।



রক্তের দাম আজ ঘামের থেকেও সস্তা 

জীবিত মানুষ আজ মৃত , অসহায় মূর্তির থেকেও অসহায় 
মানুষ আজ মানুষ মারে এক নাদেখা , অচেনা অদৃশ্যের লোভে 
আর কাড়ি কাড়ি কড়ি গলে যায় 
ওদের সেবায় ।



আমি বলেছি তাদের আহাম্মক 

যারা সেই অচেনা অশরীরির জন্য 
দূরে সরিয়ে দেয় জীবিত মানব প্রীতি ।
আমি তাদের সম্মান জানাতে অস্বীকার করিনি 
শুধু বলেছি তাদের নেশা , তাদের বদ অভ্যাসগুলো 
দূরে সরিয়ে রাখতে 
আমি আরও বলেছি তাদের জন্য কোটি টাকার বিছানা না সাজিয়ে 
অভুক্ত অসহায় মানুষের জন্য লক্ষ টাকার পান্তা থালা 
জোগাড় করা খুব কী কষ্টের কাজ ! 



এতেই তারা ক্ষেপেছে । 

বলছে আমি মহাপাপি । ঈশ্বর আল্লাহকে অস্বীকার করেছি ।



আর আমি বলছি 

হ্যাঁ তাদের পবিত্র বাণী মেনেই আমি আজ নাস্তিক হয়েছি । 
ঈশ্বর খুঁজতে গেছি এই সংসারে মানুষের মধ্যে 
কোন উপাসনালয়ে , ধর্মগ্রন্থে অথবা 
তাদের মিথ্যা অনুকরণকারীদের মধ্যে নয় ।
হ্যাঁ , আমি বিদ্রোহী 
একজন মানব প্রেমী বিদ্রোহী বীর ।



৮।।



বৃদ্ধ বলে যে সমাজ পুরাতনকে ছিঁড়ে ফেলতে চায় 

আমার কলম বিদ্রোহী হয়ে সেই সমাজেরই 
ধ্বংস দেখতে চায় ।
আমি বিদ্রোহ করি মানুষের জন্য 
বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য 
কিন্তু যখন দেখি বর্তমানের নামে ব্রাত্য অতীত 
তখন বিদ্রোহী কলম 
স্বজন ছেড়ে সেই অসহায় কাঁপাহাতের আঙ্গুল ধরতে 
ছুটে যায় । 
আমরা মানুষ । 
তবু কেন বেহুশ হয়ে পড়ি বারবার ! কেন দুদন্ড ওদের জন্য 
বাঁচতে পারি না 
যারা এত বছর আমাদের জন্য বেঁচে ছিল বারবার ।
আপনারা জানেন ,
আমি হত্যা , ধ্বংস , ভাঙ্গনের জন্য নামি নি 
আমি প্রেমিক সন্যাসী 
প্রেম বিলিয়ে দিতে এসেছি 
কিন্তু 
হে আমার যুবক সৈনিক 
এ প্রেম তো কেবল তোমাদের জন্য নয় ।
এ প্রেমে তাদেরও পূর্ণ অধিকার আছে 
যারা বয়সের ভার সহ্য করেও 
আজও তোমাদের জন্য দুয়া মাঙ্গে 
তবু আমি দেখছি 
তারা শোষিত হচ্ছে এই সমাজে বারবার 
তোমাদের এই দায়িত্বভরা দুহাতে  



আজ আমি নয় , 

আমার কলম বিদ্রোহী 
এই তোমাদেরই বিরুদ্ধে -- আগামীর যুব সমাজ ।



৯।।

আমি বিদ্রোহী 



কিছু নাদেখা স্বপ্ন হয়ে ফুটিয়ে তুলতে চাই । 

মুখপোড়া সব অন্ধ ভক্তের মধ্যে মুখখুলে 
একবার একটা প্রশ্ন করতে চাই । 
তাদের বিশ্বাসের কালো বন্ধনের মধ্যে দিয়ে 
দেখতে চাই কিছু যুক্তির শক্তি ।



আমি বিদ্রোহী সেজেছি তাই 

এই ভক্তি ব্যাপী পৃথিবীতে যুক্তির শক্তি 
একবার দেখিয়ে যাবো ভাই ।
বিনা কারণে যখন সংসারে , একটা পাতাও নড়ে না 
বিনা ছন্দে যখন কবিতায় , মেঘেরা সব গরুর মতো চড়ে না 
তখন 



আমি বিদ্রোহ করি 

আমাদের পাথরঠাসা সেই হৃদয়ের ভক্তি সাগরে 
তোমাদের সংসার যখন ঘুষখোরে ঠেসে আছে 
তখন ঈশ্বর কি একটা দানাও পক্ষপাত করবে না !
যখন তোমাদের হিসাবে দুয়ে দুয়ে ছয় হতে পারে 
তখন তিনি কেন তেলে জলে প্রদীপ জ্বালাবেন না !



আমি দেখেছি প্রচুর ভিড় 

ওই শালা মৃতদের ঘিরে -- 
আমি দেখেছি মানুষ বিকিয়ে দেয় নিজেকে 
ওই শালা ভন্ডদের পায়ের তলে ---
আমি প্রেমিক হয়ে ব্যর্থ হয়েছি 
তাই প্রেমের পথ গড়তে পথে নেমেছিলাম 
এই ভক্তি রুপি পাথর এখন সামনে আমার
তাই বিদ্রোহী হয়েছি 



শুধু ভক্তিটুকু যুক্তিতে পরিবর্তন করবো বলে । 



১০।।

বিদ্রোহ মানে , তিনটে অক্ষর নয় 
বিদ্রোহ মানে , শুধু প্রতিবাদ নয় 
বিদ্রোহ মানে , একটা ভাবনা মানুষের জন্য 
বিদ্রোহ মানে , ভালোবেসে পাশে দাঁড়ানো 
একটু ভালোবাসার জন্য ।



আমি বিদ্রোহী 

মানুষের কথা বলে যাই গানে গানে তাই 
আমি বিদ্রোহী 
মানুষের কথা লিখে যাই কলমের ভাষায় 



কোথাও দেখি মানুষের শরীর জুড়ে 

অন্যায়ের কালসিটে 
কোথাও দেখি মানুষের মনের গভীরে 
ভাঙ্গনের রক্ত ছিটে 



আমি নীরব হয়ে দেখেছিলাম ধর্মের ছলনা 

নারী হয়ে ওঠে কেমন করে পুরুষের খেলনা 



আমি বিদ্রোহী তাই কলমের হাত ধরে 

সচেতন করে যাই চিরকাল ভালোবাসার অক্ষরে ।



১১।।



চলুন আজ মানুষের বিরুদ্ধে পথে নামা যাক ।

মানুষ মানে আমরা সবাই , মান আর হুসে ভরা 
প্রত্যেকেই ।
আমাদের আচরণ আজ উন্নতির কেনা গোলাম 
বিজ্ঞানের দাস হয়ে আজ আমরা সুখী 
স্বার্থপর হয়ে উঠেছি আমরা প্রত্যেকে -- এ যুগের জনগন ।
মোবাইলের রেডিয়েশন হোক আর পারমানবিক বিস্ফোরণ 
আজ আমরা সময়কে মুঠোয় বাঁধতে চেয়েছি 
বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা সবাই হিতের বিপরীতে হেঁটে 
হানির মন্ত্র মেনে চলেছি ।



আজ বিদ্রোহী এই মানুষটিও লজ্জিত 

কারন সে নিজেও এই পথেরই পথিক 
পৃথিবীকে নিজের বাপের মনে করে 
আমিও তো সবার মতোই স্বার্থের রঙে রঙিন ।



আমি বিদ্রোহী নই আজ 

একজন কলঙ্ক , হত্যাকারী পাষন্ড নিচ 
সবারই মত 
ধিক্কার তাই আমাকেও , কলম আমার জানাতে এসেছে 
চিরকালের মত ।



যেখানে অপরাধই শত অংশে ভরা 

সেখানে শাস্তি দেবে কে ?
হে প্রভু , এই সামন্তের অনুরোধ শুনুন 
আমাদের অতীত ফিরিয়ে দিন 
আগেকার মতন ।



১২।।

সাবধান !! 
পদে পদে অচলায়তন । ডিগ্রিহীনরা আজ মসনদে আর 
ডিগ্রিধারী সব জুতোর তলায় ভুপিষ্ট । 
এ গল্প তোমার গল্প , আমার গল্প ; এই দেশের প্রত্যেকের গল্প 
এ গল্প সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্যের গল্প 
কবরের তলায় ঘুমিয়ে থাকা শোষিতদের গল্প 
এ গল্প যুগ যুগান্তরের বার্তা বয়ে আনে মিষ্টতার মধ্যে ।
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখো ; পরাধীন মন্দিরে 
পরাধীন হিন্দু থেকে মুসলমান --- 
আমাদের ঔকাদ ছিল কতটুকু জনাব সেদিন 
জুতোর তলায় চামড়ার মাঝে আটকে পড়া পেরেকের মতো ।
তারপর পাল্টে গেল পাতাটা ; স্বাধীনতার মুখোস পড়লাম 
সেদিন ব্রিটিশ এর রাজদণ্ড মিশেছিল ধুলায় 
কিন্তু স্বাধীন আমরা কোথায় হলাম ।
জয় জয় মহারাজ , তুমি ঈশ্বর হয়ে বসলে এসে মসনদে 
গণতন্ত্রের নাম ধরে আসন লুটে গেছো সত্তর বছর ধরে 
আমরা সহ্য করেছিলাম সব --- 
তবে আর নয় । তাই সাবধান !!
খুঁজে আনো নতুন ভারতের জন্য সুভাষ , নজরুল 
অথবা বিপ্লবী বীর ক্ষুদিরাম ।



পরিবর্তন আসুক নব্য এক স্বাধীনতার হাত ধরে 

পরিবর্তন আসুক ঐক্য , চিন্তা আর মানুষের মননে ।



১২।।

আমি বিদ্রোহী 



কঠিন হলেও , হ্যাঁ ; এই মৃত্যুপুরী আমার দেশ ।

বেদনাদায়ক হলেও , হ্যাঁ ; এই হত্যানগরী আমার দেশ ।
এই দেশ আমার প্রাণ হলেও , এই দেশ আমার মা নয় 
এই দেশ ধর্মনিরপেক্ষ , তবু , এই দেশ ধর্ম ভুলতে জানে না ।
এই দেশ আমার মা তাহলে কি করে হবে ?
এই দেশ আমার বোন কি করে হবে তাহলে ? 
এই দেশ কি তাহলে আমার প্রেমিকা হতে পারে ? 
পারে না । কারন আমার প্রেম শরীর নয় 
আত্মায় বিরাজ করে । 
তাহলে এই দেশ আমার হবে কি করে 
এই দেশের আমি হবো কি করে 
আর এটাই একটা অদ্ভুত বিষয় 
কঠিন হলেও , হ্যাঁ ; এই মৃত্যুপুরী আমার দেশ ।
বেদনাদায়ক হলেও , হ্যাঁ ; এই হত্যানগরী আমার দেশ ।
এই দেশ বেড়ে চলেছে অবিরাম 
সকলে মিলে একে ফাক করে দিচ্ছে প্রতিদিন 
তবু ধর্মের ত্রিশূলে কন্ডোম -- হত্যাযোগ্য অপরাধ 
দুঃশাসনের নজরে ।



অপরাধ নেবেন না , এই মিথ্যা আদর্শের দেশটাই আমার দেশ 

আর আমি বিদ্রোহী আমার এই দেশেরই বিরুদ্ধে ।



১৩।।

আমি বিদ্রোহী 



বিদ্রোহ শিখেছি তোমার থেকে 

তোমায় দেখে প্রতিবাদ জেনেছি 
শিখিয়েছ তুমি ' না ' বলতে এই সমাজে 
তোমাকে তাই, প্রেম , এই বিদ্রোহীর রক্ত সেলাম ।



 ভালোবাসার যে মন্ত্র বীজ 

পুতেছিলাম একদিন 
হৃদয়ের মাটিতে ,
আজ তা সম্পূর্ণ । 
সম্পূর্ণ , কারন তোমার পদ চিহ্ন 
আজ বুকের ওপর দাঁড়িয়ে 
রণ নেত্য করে কালি হয়ে , দুর্গা হয়ে 
বিদ্ধ করে  প্রত্যেক অসুচিময় স্বভাব ।



আমি প্রেম বিলিয়ে দিতে পারতাম না 

তোমার আদর না পেলে 
অন্যায় কে অন্যায় বলে ঘোষণা করতাম না 
জীবনে তুমি না এলে ।



আমি প্রেমিক হতে এসেছিলাম একদিন 

বিদ্রোহী হয়েছি ক্রমে ক্রমে 
কিন্তু খেয়াল করে দেখো কখনো 
সে বিদ্রোহে প্রেম ছিল সম্পূর্ণ 
সে বিদ্রোহে তুমিই ছিল আমার জগৎ জুড়ে ।



আমি আজ ক্লান্ত , 

বিদ্রোহের এ পথ এখনো অনেক বাকি 
আমার হাত শক্ত করো প্রিয়ে 
তোমাকেই তো দিশারী হতে হবে আমার । 



দিশারী , একজন পুরুষের ----

নারীদের জন্য , মানুষের জন্য বিদ্রোহী 
একজন সৈনিক পুরুষের ।



১৪।।



আমি বিদ্রোহী 




আমি বিদ্রোহের আগুন দেখেছিলাম 

একটা সুপ্ত ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির জীবন্ত রূপ দেখেছিলাম 
জীব খাদকের মুখে ।
অবলা , নিরীহ ওরা 
মুখে কথা নেই কোন 
তাদের রক্তে ধৌত হাসপাতালে 
আমি ভুলে ভরা চিকিৎসা দেখেছি প্রতিদিন ।
কসাই আজ ডাক্তারের সমনাম 
গানে গানে নচিকথায় শুনেছিলাম  
আজ দেখলাম , প্রাণদায়ি ভগবান 
দুধের পশু খুন করে , ইমেজ করছে ক্লিন ।
ওদেরও পরিবার আছে , বাড়িতে অপেক্ষা করে কেউ 
এমন ভাবনায় প্রয়োজন নেই ঘেউ ঘেউ  
তার চেয়ে মানুষ হয়েছি , পৃথিবী আমার 
এই রবে চলতে দাও শোরগোল ।
বিদ্রোহ মানে তো শুধুই মানুষের কথা বলা 
প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের জন্য পথে নামা  
দুই দলের তর্কাতর্কি , রাজনীতি ।
পশুদের জন্য ফাঁকা থাকুক রাজপথ 
পশু নিধন হোক শপথ 
যতই নিষ্পাপ হোক তার শৈশব ।
আমি বিদ্রোহী সেই মেকি মানুষদের জন্য 
যাদের কাছে ষোল শাবকের দাম শূন্য 
খুন হয়ে পড়ে থাকে চিকিৎসার মন্দিরে  
তারপর নিরুপায় দায় ছুড়ে দেওয়া হয় প্রশাসনের নামে ।



বলছি কি মশাই ,

প্রশাসন , করপোরেশন এসব তো মানুষের সৃষ্টি 
মানবিকতা হারিয়েছি যখন আমরাই
তখন অন্যের গু ঘেঁটে কি লাভ বলুন  !!



১৫।।



বিপ্লব আসে না প্রেমহীনা 

ভালোবাসা বিদ্রোহ জাগায় 
নিজের বলে কাছে ডাকে নি যাকে 
তার জন্য কি জীবন দেওয়া যায় !!



আমি বিদ্রোহী হয়েছি 

তোমার ভালোবাসা আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে 
নারী যন্ত্রনা , দারিদ্র , মানবিকতা চিনিয়েছে ।



আমি ভালোবেসেছি তোমায় 

খাঁটি ভালোবাসা 
আর তাই বিপ্লবী পাগল মন বারবার 
বেঁচে উঠেছে বিদ্রোহী হয়ে প্রেমে -- মানুষের ।





১৬।।

আমি বিদ্রোহী  



অস্থির তরঙ্গের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে মানুষ । কে যে ভালো আর কে যে কালো আমি জানি না । 

শুধু বুঝেছি যা ছিল অপরাধ , আজ সেটুকুও গ্রহনযোগ্য ।
হতেই পারে সবকিছু এই অপরাধের গোলকে । হতেই পারে কেউ আপন মিথ্যা বলেও 
তাদের ওই সামরাজ্যকতায় ।
গল্পের মধ্যে নায়ক কোনদিন ভিলেন হতেই পারে । হতেই পারে 
আছোলা বাঁশ গোপনে এসে ঢুকবে তোমার সর্বনেসে । 
হতেই পারে বন্ধু বেসে শত্রুর জয় জয়কার । হতেই পারো তুমি সিঁড়ি অসাধুর 
স্বর্গে যাওয়ার ।
এত কিছু হতে পারের মধ্যেও জিততে হবে , বলতে হবে বারবার । নামেতেই যার চৌর্য্য বৃত্তি শোভা পায় , 
রঙের তুলি তাদের কালো নির্লজ্জ মুখেও বাস্তব আর সত্যের ছাপ খুঁজে পেল - হতেও পারে 



নদীর বিপুল তরঙ্গে মরা কাঠ আর আবর্জনা ভেসে আসে আগে । সত্যের প্রদীপগুলো সমাধি নেয় 

তরঙ্গের গভীরে । তারপর একদিন দিন বদলায় ,,, আকাশের নক্ষত্ররা নির্বাক চোখে দেখে একটা কবিতা 



কবিতা 

অপরাজিত হয়ে স্রোতের উজান তরঙ্গের বিরূদ্ধে নৌকা বইছে -- কাগজে , কলমে 



এক কবি নয় , বিদ্রোহী হয়ে ।

১৭।।



আমি বিদ্রোহী 



( প্লেটো লিখেছিলেন , "আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের প্রবেশ নিষেধ।" )



এ রাষ্ট্র বিভীষিকাময় । এ রাষ্ট্র ভন্ড । 

ঢেউয়ের মত এখানে আছড়ে পড়ছে নিরীহ হাহাকার । 
এ রাষ্ট্রে দুটি মুখ - শোষক আর শোষিত 
এ রাষ্ট্রে মানুষের অধিকার আন্দোলনেই কেবল সীমাবদ্ধ ।
এ রাষ্ট্র হাতে বিশাল হানটার , গায়ে লোহার বর্ম 
চাবুক চলে এখানে নিশিদিন আর হাততালি পড়ে ঢাকতে 
ওদের আর্তনাদের শব্দ ।
লেলিন এখানে সুবিধালোভী , মার্ক্স ঘুমায় 
ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে 
সেফটি ভালভ লাগিয়ে দেশপ্রেমীরা , 
লুটছে এই সোনার দেশ ।
ফেডারেল কাস্ত্রো রাশিয়ায় , চে এখানে তামাশার পাত্র ।
মনে পড়ে এখন শুধু কলম তোমায় 
কান্না ঢাকতে বিনয়ের পায়ে গড় করে বলি ,
ফিরিয়ে আনো চাকাটা শেষবার , 
চালিয়ে দাও গলায় শেষবার 
তবে স্মৃতিমন্থন শুধু নয় এবার , চাকা ফিরে আসুক সুকান্তের কলমে শেষবারের মতো ।



কিন্তু , কোথায় সে চাকা । সে যে এখন রাজার রথের তলায় ।

হায় রে কবি ! কলম টুকু বাদ গেলোনা 
ওখানেও আজ তেল মারামারি আর রাষ্ট্রের বন্দনা 
আর কাগজে কাগজে মিথ্যে ভাষা 
দি পেন ইস মাইটার দ্যান দি সোর্ড ।



কবিদের মুখ আজ মুখোশময় , রাষ্ট্রের প্রচার যন্ত্র  তারা 

মোটা টাকা , শরীর , মদ আর মেয়েছেলের সুখ 
নেশায় নেশায় বিকিয়ে গেছে ওদের মানবিক রূপ ।
ওরাও আজ রঙ চেনে , দল বোঝে 
ওদের হাতেও ঝান্ডার নিশান ।
কিছু যারা সৎ ছিল , তারা পুরষ্কৃত হল একদিন 
জেল অথবা মৃত্যুর আলিঙ্গন ।



কৈশোরে আদর্শ রাষ্ট্র পড়েছিলাম অনেক 

বইয়ের ই পাতায় পাতায় , মার্ক্স অথবা লেনিনের কলমে 
আজ জীবনের যৌবনে দাঁড়িয়ে দেখি 
সব ঝুট হ্যায় , শুধু তাবেদারী জিন্দাবাদ লাজহীন শ্রমে ।
মনে পড়ছে সব , ফিরে আসছে চাকাটা 
গলার থেকে কিছুটা দূরে আর --
কলমটা পাশে রেখে মাটি দিলাম কবরে 
গলাটা কাটা পড়বার কয়েক সেকেন্ড আগে ।



আমি বিদ্রোহী । আমার রক্তের প্রতি কনায় লেখা এই ভাষা ।

একটা গোটা কবিতা । আমি বিদ্রোহী কবিতা ।






১৮।।



আমি বিদ্রোহী 



কঠিন হলেও , হ্যাঁ ; এই মৃত্যুপুরী আমার দেশ ।

বেদনাদায়ক হলেও , হ্যাঁ ; এই হত্যানগরী আমার দেশ ।
এই দেশ আমার প্রাণ হলেও , এই দেশ আমার মা নয় 
এই দেশ ধর্মনিরপেক্ষ , তবু , এই দেশ ধর্ম ভুলতে জানে না ।
এই দেশ আমার মা তাহলে কি করে হবে ?
এই দেশ আমার বোন কি করে হবে তাহলে ? 
এই দেশ কি তাহলে আমার প্রেমিকা হতে পারে ? 
পারে না । কারন আমার প্রেম শরীর নয় 
আত্মায় বিরাজ করে । 
তাহলে এই দেশ আমার হবে কি করে 
এই দেশের আমি হবো কি করে 
আর এটাই একটা অদ্ভুত বিষয় 
কঠিন হলেও , হ্যাঁ ; এই মৃত্যুপুরী আমার দেশ ।
বেদনাদায়ক হলেও , হ্যাঁ ; এই হত্যানগরী আমার দেশ ।
এই দেশ বেড়ে চলেছে অবিরাম 
সকলে মিলে একে ফাক করে দিচ্ছে প্রতিদিন 
তবু ধর্মের ত্রিশূলে কন্ডোম -- হত্যাযোগ্য অপরাধ 
দুঃশাসনের নজরে ।



অপরাধ নেবেন না , এই মিথ্যা আদর্শের দেশটাই আমার দেশ 

আর আমি বিদ্রোহী আমার এই দেশেরই বিরুদ্ধে ।




১৯।।



আমি বিদ্রোহী



কে বলে জাতীয় পতাকার রঙ গেরুয়া ?

কে বলে জাতীয় পতাকার রঙ সাদা ?
কে বলে জাতীয় পতাকার রঙ সবুজ ? 
কে বলে মধ্যের চক্রটা নীল ?



জলের মাছটাকে আঁশ বটির ছোঁয়ায় লাল দেখাচ্ছে 



সিঁদুরের রঙ লাল , আমার মায়ের মাথার সিঁদুর 

বাবাকে আলাদা করা হয়েছিল বিয়ের রাতেই 



তখন থেকেই মায়ের রক্ত ঝরে পড়ে 

আঁচলের কোনায় ...
তবু মা আমাদের ভালোবেসে ভাত খেতে দেয় 
পায়েস দেয় , সিমুই দেয় , গল্প বলে 



নিজের ছেলে পৃথ্বীরাজের , নিজের ছেলে আকবরের , শাহজাহানের , ক্ষুদিরামের 



আঁশ বটিটা ধরতে গেলেই মানা করে -- রক্তের ভয় পায় 

দাঙ্গার রক্ত , ভাইয়ের রক্তের ।



জাতীয় পতাকা তুলতে গিয়ে বুঝেছি 

জাতীয় পতাকার রঙ তিন নয় , চার নয় , পাঁচ নয় 



পুরো ছয় ---- 



পঞ্চমটা যদি দাঙ্গার হয় , শহীদের হয় 



ষষ্ঠটা ভালোবাসার , ভাতৃত্বের , মানবিকতার । 




আমি বিদ্রোহী । ঠিকই শুনেছেন আমি বিদ্রোহী । 

কিন্তু এই ছ ছ'টি রঙের বাইরে নয় ।




২০।।

আমার বিদ্রোহী চোখ দেখছে
দেশের মধ্যে জ্বলে ওঠে 
স্ফুলিঙ্গ ---- 
আমি দেখেছি 
সরকার গঠনের নামে গজিয়ে ওঠা 
লেনদেনি শৃঙ্গ --- 
আমি দেখেছি মূর্খ জনতা 
ফিরে আসে অসহায় 
ব্যালটের যুদ্ধ হেরে --- 
আমি দেখেছি চাঁদ এখানে 
কবিতা লেখে 
নিজের কলঙ্কের অমাবস্যার রাত্তিরে ।



বিপদের ঘন্টা বেজেছে 

ঢাক থেকে মাদলের কম্পনে 
মানুষ মরেছে মেকি আদর্শে পকেট ভরেনি , 
পেট এর রক্ত মুখ দিয়ে বয়ে গেছে শুধু ।
এখানে প্রতিদিন মিসেছে গঙ্গার স্রোত যমুনার জলে 
এখানে প্রতিদিন মরেছে হি-মু , দাঙ্গার কোলাহলে ।
মানুষের আয়ু ক্ষণস্থায়ী , নেতৃত্ব দীর্ঘজীবী 
কৃষকের দড়ি ঝুলছে গলায় , শ্রমিকের বৃত্তি ভিখারি প্রভু ।




আমার বিদ্রোহী বন্ধুগণ ,

আর সময় নেই ফ্যাসিবাদ , সাম্যবাদ , মার্কসবাদ বোঝাবার 
এখন বিদ্রোহী মন , গর্জে ওঠো ; 
নিজেকে করো আদর্শের চেয়ে বলিয়ান ।




২১।।



আমি বিদ্রোহী 




পথে পথে ঘুমিয়ে পড়ে সামন্ত্রদের লাশ 

আগুনের পরশমনির ছোঁয়ায় জেগে থাকে 
স্বপ্নভর্তি আকাশ ।



যৌনতা মারে না আর , বাঁচতে শেখায় অন্ধকার 

কলমের ঘোমটার আড়ালে , অধিকাংশেই 
ব্যবসায়ের সম্প্রচার ।



একদিকে নিজের সৃষ্টি তুলে দিতে পাঠকের হাতে 

লেখক খোঁজে প্রকৃতকে , গ্রহণের কালো প্রভাতে ।
অন্যদিকে ভয়াল বিষ , ফনায় তুলে নেয় যারা 
লেখক নামে ব্যবসা ছড়ায় ;
সম্মান ব্যাচে তাদের শিষে সাহিত্যের বসুন্ধরা ।



কেন তাদের মিথ্যা সম্মান প্রদান ? 

কেন তাদের এওয়ার্ডে বস্তা ভরা নাম ?
কেন পারে বলতে , কলঙ্ক তোমরা 
তোমাদের দুমুখো সৃষ্টি , ছুঁয়ে দেখাও পাপ ।



আমরা ধন্য , গর্বিত তার চেয়ে অনেক অনেক  

আজও বেনামি , ছোট লেখক - আমাদের সাথে জড়িয়ে ,
আজও পাঠকদের বন্ধু ভেবে নিই আপন করে
আজও কথা আর কালি থাকে , আষ্টে পৃষ্টে জড়িয়ে ।



আজও অপেক্ষা করি একটা সেলফি সবার সাথে 

আজও অপেক্ষা করি স্বাক্ষর নয় 
পরিচয় হবে আড্ডায় আড্ডায় ।
আর ওই বক তপস্বীর হোক সমনাম 
কোন সমরেশ অথবা দুঃখের কবিতা বা গান ।




আমি বিদ্রোহী । বিদ্রোহ করি কবিতায় । 

বিদ্রোহ করি সৃষ্টির অস্ত্র হাতে নিয়ে । 
কিন্তু আজ বিদ্রোহ নয় , বরং অনুশোচনা হোক 
আজ কবিতার মৃত্যু হয়েছে বইমেলার মাঠজুড়ে ।




২২।।

আমি বিদ্রোহী 



আমরা সমব্যাথি নই । আমাদের তো ব্যাথা লাগে নি কোথাও । 

যন্ত্রনা হয় নি আমাদের একফোঁটাও 
কোন রকম আঘাতে ।
আমরা যন্ত্রনা বলতে এখনো চিনি , 
কাঁটা তারে বল কুড়োতে গিয়ে কেটে যাওয়া 
আর ওরা কাঁটা তারের পাশে রাত জেগে থাকে 
বোমা কুড়াবে বলে ।
আমরা চাকরি করলে সুখ খুঁজি 
আর ওরা দুঃখ জেনেও ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিদিন 
মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে । 
একদিকে ভালোবাসার দিবসে আমাদের মধ্যে চলে 
প্রেম নিবেদন । 
অন্যদিকে ওরা ভালোবেসে জীবন দিয়ে চলে যায় ।
আমরা তাদের নখের আঘাতটুকু অনুভব করি কখনো 
সমব্যাথি হবো আমরা কি করে ? 



কিন্তু আমার বন্ধুরা 



আমরা মৃত্যু দেখেছি । রক্ত দেখেছি । সহ্যসীমা পার হয়ে গেছে । 

এবার তাই পথে নেমেছি । তান্ডব দেখবো বলে । 



আজ কতটুকু সুরক্ষিত আমরা ? কতটুকু সুরক্ষায় আমাদের সন্তান ? ভোট আসে , ভোট যায় 

প্রতিশ্রুতি হাজার বন্যা হয়ে ভাসিয়ে দিয়ে যায় 
রাজনৈতিক দল ।



কিন্তু বন্ধু , 

প্রতিশ্রুতি রাখতে দেখলাম না তো কাউকে । উল্টে আমাদের ভোজ্য টুকুও 
ওরা খেয়ে এলো জন্মদিনের আড়ালে । 



তাই বন্ধু , 

চলো আজ থেকে নিজেরা বদলে ফেলি নিজেকে 
ধর্ম , বর্ণ , জাত ভুলে 
চলো আহবান করি একটা সাম্রাজ্যের ।



রক্তবীজ হয়ে ওরা পথে নেমেছে 

আমরাও রক্তবীজ নিধন যজ্ঞে নিজেদের 
ছিন্নমস্তা গড়ে তুলি ।



বন্ধু , আর কথা নয় 

এবার অশুভ সব রক্তপানের সময় হল 
আমি বিদ্রোহী , তবে অন্যায়ের সাথে এ যুদ্ধে 
আমি হিংস্র , রক্তভোজী একটা জিভ ।



২৩।।

আমি বিদ্রোহী 




আমি ধর্মের প্রাচীরে অধর্মের গন্ধ পাই 

মানুষের মাঝখানে আর ঈশ্বর তাই খুঁজি নাই 
আমি পাই ঈশ্বর পাথরের সমাধি স্তূপে 
পাই না প্রকৃত মানুষ দাঁড়িয়ে ঈশ্বর রূপে ।
কে হিন্দু ? কে মুসলমান ? কে ইহুদি ? কে ক্রিস্টান 
জৈন , বৌদ্ধ , মহান 
আমি পাই না দেখতে ভিন্ন মাটির রং 
চাপিয়ে বুকে তার কাঁটাতার ।
আমি দেখতে ছুটি সিনেমা , ব্যবসায় মাখা 
দেখতে গিয়েও পাইনা দেখা , মুখোশের আড়ালে মানুষের
মুখ ঢেকে থাকা ।
আমি ভেদে নয়, একতার ধৃষ্টতা করি বারবার 
দেশ দ্রোহের তকমা মাথায় , করি পৃথিবী প্রতিদিন পারাপার 
আমি দেখেছি মানুষ , ঘুমিয়ে আনন্দে কাকের গান শুনে 
আমি দেখেছি মানুষ , ফেলে দেয় শিল্পীর আসল শিল্প 
নাক ব্যাকানো কেতাবি ঢঙে ।
আমি দেখেছি শ্রমিকের রক্তে রঙিন হয় 
সমাজের রেলগাড়ি 
মালিকের কালো হাত আমি দেখি করে 
গরিবের ঘাম চুরি 
তবু নীরব থাকি , চুপচাপ সয়ে যাই ভয়ে 
হয়তো হিন্দু বলবে , তুমি কাশভ সন্তান 
মুসলিম বলবে , তুমি আল্লাহর সন্তান নয় ।



গঙ্গা জানেন আজও বন্দি 

শিবের ওই বুড়ো এলকেশে 
লক্ষ্মী জানেন আজও বসে 
নারায়নের বৃদ্ধ চরণে ।
আর কতদিন স্বাধীন দেশে মানুষের 
স্বাধীনতা থাকবে হয়ে এক প্রহসন 
আর কতদিন ধরমের আড়ালে মানুষ 
সইবে জিহাদি অপমান ।
আর কতবার অবতার আসবে নেমে 
মৃত্যুর এই দেশে 
আর কতবার গাঁজা টেনে ঘুমাবে যৌবন 
বুড়ো শিবের নামের আবেশে ।



অনেক তো হল 

অনেক দিন তো পেরিয়ে গেল 
একবার তো পরিবর্তন হয়ে যাক ।
আর কতকাল সেই আল্লাহ , সেই ভগবান , সেই যীশু 
ভাগ্য বিধাতার পাবে প্রশ্রয় ।
এবার তরুণ রক্তে হোক কোন তরুণ অবতার 
না হয় আবার শুনবে তিন বিশ্ব 
যুদ্ধের হুংকার ।
লন্ড ভন্ড হয়ে যাক সৃষ্টি 
ক্ষোভের আগুনে 
সৃষ্টি হোক মঙ্গল , বর্তমান অমঙ্গল ভবনে ।




২৪।।

হরিণের মতো ঘর্মাক্ত পথ ছুটছে 
থেমে আসছে ঘড়ির কাঁটা 
ফ্যাকাসে আকাশ ঘাম মেখে বসে 
রোদের আলো ছুঁয়ে বৃষ্টি নামুক 
দুপুর জোছনায় ।



আজ চাই না আপনজন , 

সবাইকে পর করে পেড়িয়ে যায় আইন 
আমার পাশের বাড়ির গোয়াল ঘরে 
গরুগুলো ডাক ছাড়ে , গলা ছেড়ে 
ঘুম ভেঙে দেখছি, বুঝেছি ধীরে ধীরে 
ওরা ছাড়া এ দেশে আর কেউ ভারতীয় নয় ।



সাদা হিমালয়ের গলায় সাপ জড়িয়ে আছে 

ঠিক যেন সৈনিক , সকালের গেরুয়া আলোতে 
কফিন বাঁধা ।
কাল রাতে মৃত্যুর শীতল দুটো হাতে 
কেড়ে নিয়ে গেছিল ওদের সমস্ত পরিবার ।



আজ তারাও দাঁড়িয়ে নাগরিক পঞ্জিকায়

সরণির ধারে মিছিলে নেমেছে যেখানে হাজার হাজার 
উদ্বেগ , উৎকণ্ঠা ; ছিল যত বন বাদার 
এদো গলির কোনা খামচায় ।



আর কিছুক্ষন 

নতুন পাঠশালা সামনে দাঁড়িয়ে আমার 
জাতীয় পতাকার রঙ স্পষ্ট চোখে দেখলাম 
তিন নয় , চার নয় কেবল এক ।
এদেশের জন্য দেশভক্ত শহীদ হওয়া যায় 
দেশভক্তি আজ শুধুই প্রথম বর্ণের অনাচারজাত অধিকার ।



কি বিচিত্র রামায়ন না ! কি বিচিত্র ধর্মের নামে প্রহসন 

ঘুম ভাঙলো যখন , বুঝলাম তখন 
রাম নয় ; হনু ছাড়া এ দেশে আজ আর 
একটিও ভারতীয় নাই ।





২৫।।



প্রত্যেক ছুটির জন্য দায়ী তারা , যারা বিচারক তো হয়ে বসে আছে সিংহাসনে । কিন্তু বিচার করার জন্য কতজন , নিজের বুকে হাত রেখে বলুক , একবার পাতা উল্টেছে গুণীজনের । সবার তালিকা ইয়া লম্বা , হাতে গোনা কিছু নাম । আরে নাম বড় না সৃষ্টি , তুমিই বলো ভগবান । কতজন গুণী এ অভাগা দেশে কদর পায় , গেঁয়ো যোগিরা অভাগা এ দেশে ভিক কুড়িয়েই একদিন হারিয়ে যায় । লবিবাজ আজ কাদের বলি , আমরাই তো লবি বানাই । আরে , নাম বড় না সৃষ্টি , তুমিই বলো ভগবান ।

সবাই বলে , একে দেখো , ওর মতো হও । কতজন আজও ভেবে বলো তো সৃষ্টির রসে ডুবতে চাও ? তুলনা করে গেলে , সারাটাজীবন ; আরে , লবিবাজ তো তোমরাই বানাও 
কোন সাহসে বিচারক তুমি , লবিকে আজ ফাঁসির বাণী রোজ শোনাও । 



বলো , বলো , নিজেরাই । ভাবনা শুরু করো আজই । নাহলে  বিপদ ঘনিয়ে আসবে সবার ... সেদিন লবি নয় তোমরাই ঝুলবে , ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে । 



Friday, 19 June 2020

রেল কলোনির আড্ডা ( পর্ব ২)

ওভালের সাথে জড়িয়ে আছে আমার ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি । ১৫ই আগস্টের আগে বৃষ্টি হওয়া যেন প্রকৃতির থেকে পূর্ব নির্ধারিত ছিল আর তার ফলে পরের দিন মাঠের কাদা ঢেকে ফেলতে লাল পাথর গুঁড়ো কি করে ভোলা যায় । সাদা জামা প্যান্ট এর অবস্থা যে কি হতো তা একমাত্র চিত্তরঞ্জন বাসীরাই জানে । এদিকে কাক ভোরে স্কুল থেকে হাঁটা পথে ওভাল যাত্রা শুরু হত । তারপর সেখানে এটেন্ডেন্স নেওয়া হতো । কিছু কিছু বিচ্ছু ছেলে অবিশ্যি আগে ভাগেই মাঠে পৌঁছে যেত এবং সুযোগ বুঝে নিজের স্কুলের দলে এসে মিশে যেত । কারুর চেনবার বা ধরবার জো ছিল না । 


এই একই ঘটনা দেখা যেত ২৬সে জানুয়ারি । ফ্ল্যাগ হোস্টিং , জি এম এর ভাষণ , মার্চ পাস্ট , মাস ড্রিল , ইন্টারস্কুল স্পোর্টস এ সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত ওভালের ওই গোলাকারের মধ্যে । এছাড়া বাবার মুখে শুনতাম কোন এক সময় ওভালের এই মাঠে এককালে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রাদল আসতো । আর সত্যি বলতে চিত্তরঞ্জন চিরকালই শিল্পীদের মাতৃস্থান হয়ে থেকে গেছে । অগুনতি শিল্পী এই চিত্তরঞ্জনে জন্মেছে , বড় হয়েছে ; আবার অনেক শিল্পী কর্মসূত্র ধরে একসময় এসেছিল এই রেলশহরে । ভাবা যায় ওভালের ওই পরিধির মধ্যে আশা ভোঁসলে , রাহুল দেব বর্মনের মত নামি শিল্পীরাও অনুষ্ঠান করে গেছেন । সত্যিই এই শহরের বহুমুখী দিক আকৃষ্ট করে যতবার তার দিকে ফিরে তাকাই । তবু চিত্তরঞ্জন সব সময় একটাই মন্ত্র শিখিয়েছে সবাইকে , দূরে যাওয়ার মন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে  , নিজের পায়ে দাঁড়াতে । রেল ইঞ্জিনের এই শহর তাই তো রেল সুবিধা দিয়ে গেছে আমাদের বারবার যাতে যাতায়াতের সমস্যা না হয় । উন্নতির দিকে যাত্রা , প্রগতির দিকে যাত্রা । আর যাত্রা বললাম যখন তখন শ্রীলতার মাঠ কি ভোলা যায় । রাত জেগে যাত্রা দেখার সুযোগ আমার আজও হয় নি কিন্তু বড়দের মুখ থেকে শুনেছি , কত নামি দামি শিল্পীরা ছুটে এসেছে চিত্তরঞ্জনে শো করতে । তাদের মধ্যে কিছু নাম বলছি , কুমার শানু , নচিকেতা , রবি ঘোষ , পি সি সরকার প্রভৃতি ; কারন সব নাম নিলে চিত্তরঞ্জন ভরে যাবে তবু নাম শেষ হবে না । ওভালের পাশেই  চিত্তরঞ্জন গেস্ট হাউস ও তার সামনে অবস্থিত শিশু বিহার স্কুল । এই ৬৩ নম্বর রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেও ১ নম্বর গেটে পৌঁছানো যায় । সেক্ষেত্রে পথে দেখার মত দাঁড়িয়ে সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট স্কুল । এই ১ নম্বর গেটে যাওয়ার আরো দুটি রাস্তা আছে যার একটি অফিসার কলোনি বা সানসেট এভিনিউ আর একটি ম্যানগ্রোভ এভিনিউ বা মূল বাস রাস্তা । সে দুটি সম্বন্ধে পরে বলবো একদিন । 


ম্যানগ্রোভ এভিনিউ আর গণপতি এভিনিউ একই রাস্তার দুটো নাম । গণপতি হাট সংলগ্ন রাস্তার নাম গণপতি এভিনিউ আর ১ নম্বর গেট থেকে ওভাল অবধি এই রাস্তার নাম ম্যানগ্রোভ এভিনিউ । ওভালের ঠিক উল্টো দিকে এস পি ইস্ট বাজার আর বাজারের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রঞ্জন সিনেমা ও বাসন্তী ইনস্টিটিউট । রঞ্জন সিনেমাটি বর্তমানে আধুনিকতার ছাপ লাগলেও , পুরোনো হলে বাবার হাত ধরে দেখা ইংরেজি সিনেমা দেখার মজা আজও মনে লেগে আছে । তখন হলটিতে নতুন সিনেমা লাগতো না । রিলিজ হয়ে যাওয়া সিনেমা অনেক হাত ঘুরে এসে পৌছাত হলের পর্দায় । তবু লোকের আগ্রহ কোন ভাবেই কম ছিল না । তাছাড়া রঞ্জনে মাঝে মাঝে জলসার আসর বসতো । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর মত নামি শিল্পীও এই রঞ্জনে জলসা করে গেছেন । এস পি ইস্ট মার্কেট থেকে বাস রাস্তা ধরে গণপতি এভিনিউ ধরে হাঁটলে পৌঁছে যাওয়া যায় এরিয়া ২ ডিস্পেন্সারি র সামনে । এই ডিস্পেন্সারির ঠিক পাশেই এক কালে মহিলা মহলের দুর্গাপুজো হতো । এই পুজোর বৈশিষ্ঠ ছিল সম্পূর্ণ পুজোটি মহিলা দ্বারা পরিচালিত ছিল এবং পুজো কমিটিতে কোন পুরুষ সদস্য ছিল না । বেশ কিছু বছর পুজো হওয়ার পর পুজোটি অবশেষে বন্ধ হয়ে যায় । তবে এর স্মৃতি আমার মনে আজীবন জ্বলজ্বল করবে । 


এই পথ ধরে আর একটু এগিয়ে গেলেই এস পি নর্থ মার্কেট । এই বাজার এর বেশ কিছু স্মৃতি পরের পর্বে আলোচনা করবো , কেমন ।
নর্থের বাজারে ঢুকেই পড়লাম যখন তখন আজ আর কোন কথা বলবো না । বরং একটা কবিতা হয়ে যাক আজ । আরে আরে মুখ ভার করলে চলবে ? চিত্তরঞ্জনে এলে আড্ডা না দিয়েই চলে যাবে ? চিত্তরঞ্জন মানেই তো আড্ডার শহর । চিত্তরঞ্জন মানেই তো হুল্লোড়ের শহর । শীতের সন্ধ্যে বেলা সকলে গোল করে বসে আগুন সেঁকা আর গরমে ঘরে কে ঢুকবে ? ভেতরটা ভ্যাপসা । পাপাই , বুকু , মিঠু , ফুচান , আমি , পুকান , পোষন সবাই বোস আজ । আড্ডা দেবো জমিয়ে । সামনে না পারি এই বইয়ের পাতায় সকল চিত্তরঞ্জন বাসীর মহা আড্ডা । সবার আমন্ত্রণ কেন ? কারন এ শহর ভেদাভেদ জানে না তাই । কবিতাটা আমার সাথে বলো , পুরোনো প্রেমিকার কথা মনে পড়ে যাবে । পুরোনো প্রেমিকাটা কে ভাবছো তো ? দুর্গা পূজার এই নর্থের বাগানেই একটা ঝালমুড়ি খাইয়ে চারদিন চুটিয়ে গল্প করেছিলে যার সাথে ভলেন্টিয়ারের বেঞ্চে বসে বসে । তার কথায় বলছি গো । এবার আসর শুরু করি তাহলে আজকে ?  


নর্থ মানেই রাত জাগা আড্ডার মহড়া 
নর্থ মানেই চা সিগারেট , মিষ্টি আর সিঙ্গারা 
নর্থ মানেই মন্টু ঘোষ 
নর্থ মানেই ডালপুরি , রসগোল্লা 
নর্থ মানেই অজানতিক ফুটবল 
আর স্কাউটে র ছেলে ছোকরা ।
নর্থ মানেই দুর্গা পুজো - প্রস্তুতি থেকে বিসর্জন 
নর্থ মানেই বিশাল ঠাকুর - মেলায় বসে বসে 
ভাজা সেই বাদাম ভোজন ।
নর্থ মানে বন্ধু হয়ে যাওয়া মুহূর্ত 
নর্থ মানে পাশের বাড়ির খবর রাখা 
নর্থ মানেই দেওয়ালির খুব ভোরে 
ক্যান হাতে মণ্ডপে মণ্ডপে ভোগ আনা ।
নর্থ মানে দোল খ্যালে - হিন্দু থেকে মুসলমান 
নর্থ মানে ঈদের সিমুই , বড়দিনের কেক 
আর একটা পুরোনো নেশা , নতুন বোতলে সিল করা ।


সুন্দর পাহাড়ি নর্থ বাজারে ঢুকেই পড়েছি যখন তখন একজনের নাম না বললে ভীষন অন্যায় হবে । তিনি হলেন মন্টু ঘোষ । মিষ্টির জগতে এক উল্লেখযোগ্য নাম এই মন্টু ঘোষ । তবে তার থেকেও উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় তার কর্ম উদ্যম মানসিকতা । সকাল থেকে রাত অবধি দোকান ও রান্না হওয়া মিষ্টি তৈরির প্রবল তত্ত্বাবধান তার সফলতার মূল মন্ত্র ছিল । ধীরে ধীরে ওই স্থান মানুষের মিলনস্থলে পরিনত হয়ে ওঠে । একসময় চিত্তরঞ্জনে চাকরি নিয়ে এসেছিলেন খরাজ মুখার্জীর মতো অনেকেই । সন্ধ্যে বেলা ওই দোকানের সামনের ফাঁকা জায়গায় সময় কাটিয়ে গেছেন তাদের মত নামি দামি ব্যক্তিরাও । যারা এখনো এ দোকানে যান নি তাদের জন্য বলে রাখি  "কালাকাঁদ 'আর "ভাপা' সন্দেশ এর সাথে মন্টু ঘোষের নাম মিষ্টির ইতিহাসে প্রচণ্ড ভাবে জড়িত । 


এছাড়া নর্থের দুর্গা পুজোর একটা ইতিহাস আছে । পুজোর সময়ে নানা মানুষ ও নানা দোকানের সমাহারে জায়গাটি হয়ে ওঠে বহু মানুষের মিলন ক্ষেত্র । পাশাপাশি পুজোর ঐতিহ্য স্থানটিকে করে তোলে চিত্তরঞ্জনের ম্যাডক্স । তবে শুধু নর্থের দুর্গাপুজো নয় , অন্যান্য অঞ্চলের পূজগুলিও যে কোন এলাকাকে টেক্কা দিতে পারে এ ক্ষেত্রে । সেসব পুজো নিয়ে একটা গোটা পর্বে আলোচনা করবো । এখন আপাতত এগিয়ে চলি । 


নর্থের প্রতিবেশী বলতেই যে অঞ্চলের নাম মানুষের মুখে উঠে আসে সেটি হলো সিমজুরি । বাজার ছেড়ে বড় বাস রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই চার মাথার মোড় । বাদিকে কুশবেদিয়া যাওয়ার উন্মুক্ত পথ আর ডান দিকে ফতেপুর যাওয়ার রাস্তা । সিমজুরির প্রবেশ দ্বার এখান থেকেই শুরু । 
সিমজুরি নিয়ে বলতে পারা , লিখতে পারা এ নেহাতই দুঃসাহস আমার কাছে , কারন এত ইতিহাসময় আমাদের চিত্তরঞ্জন শহরটি যে প্রথম দিকের শহরের বর্ণনার জন্য আমাকে বিভিন্ন জনের অভিজ্ঞতা তুলে নিতে হয়েছে । ১৯৪৩ সালে সিমজুরি ছিল সাঁওতাল সম্প্রদায়ভুক্ত একটি গ্রাম । অজয় নদের পাশে অবস্থিত এই গ্রামটি কোনদিন চিত্তরঞ্জন ভুক্ত হবে একথা তখন কেউ কোনদিন ভাবতেও পারে নি । 


১৯৫০ সালে সিমজুরি অন্তর্ভুক্ত হলো পশ্চিমবঙ্গে, অন্তর্ভুক্ত হলো চিত্তরঞ্জন নামক এক রেল নগরীতে । নগরায়নের ছাপ লাগলো আদিবাসী এই অঞ্চলের বুকে । জীবনযাত্রা পরিবর্তন হতে শুরু করলো সিমজুরি , ফতেপুরের মতো এলাকাগুলো । শুধু কিছু চিহ্ন ভগ্ন রুগ্ন দশায় দাঁড়িয়ে রইল সভ্যতার মধ্যেও , ঠিক যেমন ৮৮ নং রাস্তায় গেলে সিমজুরির সেই কেল্লা আজও দেখা যায়। 



( চলবে )

Thursday, 11 June 2020

রেল কলোনির আড্ডা


( তথ্য আরো অনেক কথা বলতে পারে , কিন্তু এই লেখাটি আমার দেখা ও বাবা জ্যঠাদের মুখ থেকে শোনা অভিজ্ঞতা ) 


গ্রাম্য পরিস্থিতির মধ্যেই বড় হয়েছি । গ্রাম চিরকাল তাই আমার মনের মধ্যেই রয়ে গেছে একটা ছাপ হয়ে । সত্যি বলতে গ্রাম নিজের বাহ্যিক দিক থেকে শহর থেকে অনেক পিছিয়ে । অনেক গ্রাম এখনো অন্ধকারে ডুবে আছে । এখনো বহু গ্রাম অনেক পিছিয়ে । তবে গ্রামের আভ্যন্তরীণ রূপটা সত্যিই মনহারি । সেই ভাগা , কুসবেদিয়ার আতিথেয়তা আমাকে খুব টেনে নিয়ে যেত । আর যেটা আরো বেশি আকৃষ্ট করতো তা হল তাদের সরলতা । ওই সরল আদিবাসীদের মুখ চেয়ে মনে হতো না কোনদিন ওরা কাউকে ঠকাতে পারে কখনো । বাবার মুখে এই সাঁওতাল গ্রাম ও আদিবাসীদের নিয়ে অনেক সত্যি ঘটনা শুনেছিলাম । যত শুনতাম ততই এই মন পালাই পালাই করে উঠতো । বেশ অনেকবারই গেছিলাম সেই গ্রামে । মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম ওই মাটির ওপরে বসে । সেই অভিজ্ঞতা আজ না বললে খুব অন্যায় হবে । তবে তার আগে বাবার মুখ থেকে শোনা একটা গল্প বলি । 

চিত্তরঞ্জন শহরে একবার বাঘ বেড়িয়েছিল । সারা গ্রাম রাত জেগে কাটিয়েছিল বেশ কয়েক রাত । বন দপ্তরকে খবর দেওয়া হল , কিন্তু বন দপ্তর বাঘটিকে খুঁজে বের করতে না পেরে ফিরে গেল । তারা ধরে নিয়েছিল অজয় নদ পার করে বাঘটি তৎকালীন বিহারে ঢুকে পড়েছে । কিন্তু তাদের অনুমান সম্পূর্ণ ভুল ছিল । দুদিন এর মধ্যেই বাঘের গর্জনে সারা শহর জেগে উঠল । আদিবাসীরা মাদলের শব্দে ঢেকে ফেললো গোটা এলাকা । মশাল হাতে সারা রাত জুড়ে চললো খানা তল্লাশি । অবশেষে , ভোর বেলায় বাঘটিকে শিকার করা হল , সৌজন্যে সাঁওতাল আর আদিবাসী শ্রেণী । সত্যি অদ্ভুত সেই আদিবাসী ভাবনা , অদ্ভুত তাদের ভালোবাসা মানুষের জন্য , অদ্ভুত তাদের ভালোবাসা আমার শহর চিত্তরঞ্জনের প্রতি । 

চিত্তরঞ্জন শহরে কাটানো দশ বছরে দশ হাজার জীবনের আনন্দ আমি উপভোগ করেছি । উপভোগ করেছি এর ইতিহাস , এই শহরের গরম , এই শহরের শীতের কুয়াশা , আদিবাসী প্রতিবেশী গ্রামের আপনতা , সূর্যোদয়ের ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য্য , গাছপালায় ঘিরে থাকা একটা নাম : শহর থেকে দূরে একটা শহর : চিত্তরঞ্জন । অনেকেই এই শহরটাকে কাড়া নগরী নাম দিয়ে থাকলেও , এই শহর কোনদিন কাউকে নিজে থেকে বেঁধে ফেলেনি , বরং এই শহরে যে বা যারা এসেছে , তারাই বাঁধা পড়ে গেছে এর মায়ায় । বহু দিনের চেষ্টার মধ্য দিয়ে আমার প্রাণের শহরটাকে সকলের প্রাণে মিলিয়ে দেওয়ার এক ছোট্ট প্রচেষ্টা এই লেখা । শুরুটা তার হোক আমার এলাকা এরিয়া ২ অথবা সুন্দর পাহাড়ি নর্থ থেকে , যেখানে কাটানো দশ বছরে দশ কোটি ঘটনা একটু একটু করে ফুটিয়ে তুলবো আর তার মধ্যে দিয়ে সবাই দেখতে পাবেন একটা ভারতবর্ষের ছবি ; যার বৈচিত্রের মধ্যেও কত ঐক্য । তাহলে ক্যামেরা ঘোরানো যাক আর অফিসার কলোনি ধরে সটান ঢুকে পড়া যাক ৭০ নম্বর রাস্তার এক প্রান্তে যার কোয়ার্টার নম্বর শেষ হয়েছে ৭৬/বি - তে । এর পড়েই একটি চার মাথার মোড় পার করলেই ঢুকে পড়া যায় অফিসার কলোনির বাংলোর দরজায় । এই পিচ রাস্তার দুদিকে সারিবদ্ধ ভাবে বাংলো দাঁড়িয়ে আছে আর পথটি শেষ হয়েছে মিহিজাম সংলগ্ন ১ নম্বর গেটের কাছে । পথটি স্থানীয়ভাবে সানসেট এভিনিউ নামে পরিচিত । রাস্তার প্রায় শেষের দিকে অবস্থিত জি এম বাংলো আর ঠিক তার উল্টোদিকে রয়েছে একটি বন সৃজন প্রকল্প আর একটি গল্ফ কোর্স । এই স্থান থেকে সূর্যাস্ত দেখার মজা সত্যিই অপরূপ ও মনহরিনী । 

চিত্তরঞ্জন রেলস্টেশন থেকে বেরিয়ে যে রাস্তাটা বেরিয়ে আসছে তার বাইরে রয়েছে মিহিজাম । রেলস্টেশন এর প্ল্যাটফর্মটি বাঙলায় থাকলেও , স্টেশনের বাইরের এই মিহিজাম শহরটি কিন্তু বিহার ( বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের ) অন্তর্ভুক্ত । স্টেশনের পাশ থেকেই দুমকা , রাঁচি , দেওঘর প্রভৃতি ঝাড়খণ্ডের বাস ছাড়ে । বাস স্ট্যান্ডের সামনে রিকশা স্ট্যান্ড এবং সেই রিকশা স্ট্যান্ড পার করে হাটতে থাকলে দুপাশে তরি তরকারি বাজার । এরই মধ্যে দিয়ে রাস্তাটি অটো স্ট্যান্ড পার করে হাজির হয় একটি গেটের সামনে । গেটের দুপাশে বাংলা ও বিহারের ( বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের) সীমানা নির্ধারক প্রাচীর পূর্ব পশ্চিম দিক বরাবর দাঁড়িয়ে । এই গেটটি ১ নম্বর গেট নামে পরিচিত । ১ নম্বর গেট পার করেই চিত্তরঞ্জন শহরটির মূল ভূখণ্ড শুরু হয় । 

এই ১ নম্বর গেটের পাশেই ( চিত্তরঞ্জনের দিকে ) কলকাতা , আসানসোল , বর্ধমান , মালদা প্রভৃতি জায়গায় যাওয়ার বাস ছাড়ে । এখান থেকে চিত্তরঞ্জন হলদিয়া ভায়া কলকাতা যাবার এস বি এস টি সি বাস পরিষেবা পাওয়া যায় । এছাড়াও অসংখ্য মিনি ও লোকাল বড় ও এক্সপ্রেস বাসও এখান থেকে পাওয়া যায় । 

চিত্তরঞ্জন শহরটি তৈরি হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে । তার আগে অবধি জায়গাটি সাঁওতালদের বাসস্থান ছিল এবং এর পর রেল কোম্পানি এই জায়গাটি কারখানা নির্মাণ করতে এগিয়ে এলে সাঁওতালদের থেকে প্রচন্ড প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় । অনেক লড়াই এর ইতিহাস লেখা হয়েছিল একটি আধুনিক রেলশহর নির্মাণের পিছনে । এই লড়াইয়ের ইতিহাস আজও লিপিবদ্ধ আছে ডিভি বয়েজ স্কুলের পাশে গণপতি হাটের ভেতরে । অবশেষে ১৯৫০ সালে কারখানায় উৎপাদন শুরু হয় এবং ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এখানে কয়লায় টানা ইঞ্জিন ও ডিজেল ইঞ্জিন তৈরি করা হতো । তবে পরবর্তীতে এই কারখানায় ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিন নির্মাণ শুরু হয় । 

চিত্তরঞ্জন শহরটির নাম রাখা হয় দেশবন্ধুর নাম অনুসারে এবং এখানে একটি অডিটোরিয়ামের নাম বাসন্তী দেবীর নামানুসারে করা হয় । অন্যটি নামকরণ করা হয় শ্রীলতার নামানুসারে । বাসন্তীর ঠিক পিছনে শহরের একটি সিনেমাগৃহ রঞ্জন সিনেমা অবস্থিত । 

বর্তমানে রেলের উদ্যোগে রঞ্জন সিনেমাটির আধুনিকীকরণ করা হলেও এই শহরের দ্বিতীয় সিনেমা শ্রীলতা হলটি আর জীবিত নেই । শ্রীলতার ঠিক সামনে রবিন্দ্রমঞ্চ তৈরি করা হয়েছে । এই রবিন্দ্রমঞ্চে শহরের বিভিন্ন জলসা ও অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে । এই হল খুবই সংক্ষিপ্তভাবে চিত্তরঞ্জন শহরটির একটি নকশা , যার কেন্দ্রে রয়েছে রেলইঞ্জিন কারখানা এবং তাকে ঘিরে বিভিন্ন আয়োজন । এছাড়াও শহরটির নানা দর্শনীয় জায়গা আছে যা আগামীতে বলবো । তার সাথে এও বলবো যে রেল এই অঞ্চলটিকে কেন বেছে নিয়েছিল কারখানা নির্মাণের জন্য ।

সত্তরের যে কোয়ার্টার এ আমার জীবনের মূল্যবান সময় কেটেছে আজ সেই পথ ধরে বেড়িয়ে পড়বো একটু আশে পাশের সফরে । মূল বাস রাস্তা বা চ্যানাচুর মোড় থেকে বেশ কয়েকটা মোড় পেড়িয়ে সত্তরের মোড় । এই চ্যানাচুর মোড়  থেকে ডানদিকে তাকালে দেখতে পাবেন দেশবন্ধু বয়েজ ও দেশবন্ধু গার্লস স্কুল । দেশবন্ধু বয়েজ এর সামনে অবস্থিত গণপতি হাট , যা চিত্তরঞ্জনের প্রথম এডমিনিষ্ট্র্যাটিভ বিল্ডিং ছিল । বর্তমানে এই ডিভি বয়েজ স্কুলের পাশে যে ফাঁকা জায়গা ছিল সেখানে তৈরি হয়েছে ইন্ডোর স্টেডিয়াম । সারা ভারতের নানা প্রতিযোগিতা এই ইন্ডোর স্টেডিয়ামে হয় আর এটা সত্যিই এক গর্বের বিষয় । গণপতি হাট নিয়ে পড়ে একসময় বলবো , তবে আজ তার পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে এগিয়ে যাই আরো খানিকটা । সামনেই একটি মোড় যেখানে বর্তমানে তৈরি হয়েছে চিত্তরঞ্জনের ৫০ বছর পূর্তিতে একটি হাত । এই রাস্তা শীত , গ্রীষ্ম , বর্ষা সমস্ত ঋতুতে কত সাইকেল , স্কুটারের ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে তা একজন চিত্তরঞ্জন বাসী খুব ভালোভাবে জানে । তবে চিত্তরঞ্জন কোনদিন এর জন্য কোন অভিযোগ করে নি । বরং গণপতি এভিনিউর এই পথ চিরটাকাল কলকাতার পথ ঘাটকে অনায়াসে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বারবার । কোন ফাটল নেই , বর্ষার জল জমে না কোনদিন । এই হল আমার শহর । তবে , এই শহরের আর একটি দিক আছে যার সাথে স্মৃতি আকড়ে পড়ে থাকে । সেটা হল ওভাল মাঠ আর তার সংলগ্ন অঞ্চল । পথ চলতে চলতে সেটাও জানাবো একদিন না হয় ।

সত্তর থেকে শুরু করে একটা চক্র শেষ করে ফিরলাম ঠিকই , তবে অনেক পথ ঘুরে আসা এখনো বাকি থেকে গেছে । বাকি থেকে ওভালের লাল মাটি অথবা কুয়াশা ভেজা ঘাসের মধ্যে আড়চোখে দেখে নেওয়া নিজেদের প্রেমিক অথবা প্রেমিকার মুখখানা , দেখে নেওয়া বন্ধুত্বের প্রাপ্তিগুলো , স্যারদের সাথে মেতে ওঠে প্রাপ্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক উল্লাসে , জনগণমন র গানে মধ্যে জেগে ওঠা দেশ প্রেম -- এ সবই তো একটা চ্যাপ্টারে বলে দিতে পারবো না । কারন চিত্তরঞ্জন এক চ্যাপ্টারের গল্প নয় । এই শহর কিছু নেই এর মধ্যেও অনেক কিছু আছের কথা । এই শহর স্কুল বাঙ্ক করার মধ্যেও স্কুলে ফিরে আসার শহর , এই শহর একটা মিলন ক্ষেত্র - গ্রাম ও শহরের , আদিবাসী ও শহরের , আদিম ও প্রাচীনের । আগেই বলেছিলাম না , এই শহর একটা গোটা ভারতবর্ষ : বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য । আজ যাত্রা আবার শুরু করবো , ভাগ করে নেবো কিছু অভিজ্ঞতা তবে ওভালের দিকে নয় । আজ ৭১ ও ৭৩ পার করে নেমে যাবো নীচে , সাঁওতাল পরগনার মধ্যে ; যেখানে প্রায় যেতাম আমার ছেলেবেলায় । একবার ঘুরে আসবো সেই শান্তির আশ্রয়স্থল শিব মন্দিরে । তাহলে চলো বেড়িয়ে পড়ি । শুভস্য শীঘ্রম । 

সত্তরের পাশে ৭১ ও ৭৩ নম্বর রাস্তা পার করতে করতে প্রায়ই ভাবতাম , এরা বুঝি হিসাব জানে না । তাই ৭২ নম্বরটা হিসাব করে নি । কিন্তু তার পরেই ৭৩ এর মোড়ে পৌঁছে তিনটে জিনিসের আকর্ষণ আমাকে কেমন যেন সব ভুলিয়ে দিত । 

ক) পন্ডিতজীর পানের দোকান । প্রতি রবিবার দুপুরে  মাংস ভাত খেয়ে বাবার সাথে গিয়ে হাজির হতাম সেই পানের দোকানে । বাবাকে দেখলেই পন্ডিতজী বুঝে যেত দুটো মিষ্টি পান আর আমার ফাউ হিসাবে পাওনা ছিল এক মুঠো মৌরি আর চেরি । সেই মৌরি চেরির স্বাদ আজও ভুলতে পারি নি । আজকাল অনেক মশলা দিয়ে তৈরি দামি দামি মিষ্টি পানের স্বাদ ওই সাধারণ পানের কাছে হার মানতে বাধ্য । পন্ডিত জি খুব সুন্দর রাম চরিত মানস পাঠ করতেন । অনেকবার শুনেছি সেই সুর আর যত শুনেছি ততই হারিয়ে গেছে তার মাধুর্য্যে । পন্ডিত জির বাড়ি ছিল ৭১ নম্বর রাস্তায় আর তার বাড়ি যেতাম শুধুমাত্র তার পোষা কুকুরটিকে দেখবো বলে । 

খ) ৭৩ এর শিব মন্দির । পাহাড়ের উপর অবস্থিত এই শিব মন্দির আমার ছোটবেলার অনেক স্মৃতি বহন করে । যখনই মন খারাপ হয়ে যেত তখনই এই মন্দিরে এসে বসে থাকতাম । এক অদ্ভুত শান্তি ছিল মন্দির জুড়ে । বাবার মুখে শুনেছি মন্দিরটি আগে ছোট্ট মতন ছিল , পরে সেটিকে বড় মন্দির করা হয় । শিবরাত্রি ও নীলের উপসে সেই মন্দিরে কতবার গেছি তার হিসেব নেই । আর তাছাড়া নর্থের শিব মন্দির ছিল আমার কাছে মন পরিবর্তনের এক অমূল্য জায়গা । পাহাড়ের ওপরে বসে সাঁওতাল পরগনার রূপ দেখতে দেখতে কোথায় যে হারিয়ে যেতাম তার ঠিক ঠিকানা ছিল না কোন । চারিপাশের সবুজ ধানক্ষেত আর অন্য পিঠে গড়ে ওঠা নগর সভ্যতা আমাকে অনায়াসে আকৃষ্ঠ করতো বার বার । সেই শিব মন্দিরের পাশে ছিল একটা রাম ও হনুমান মন্দির । জন্ম অষ্টমী ও রাম নবমিতে সেখানে ভিড় উপচে পড়তো বরাবরই ।

গ) সাঁওতাল গ্রাম ও তাদের সংস্কৃতি । সাঁওতাল পরগনায় কত বিকেল , কত সকাল আমি কাটিয়েছি তার হিসেব নেই । সেই আল , ধানের শীষ তুলতে যাওয়া , সেই কাঠের ব্রিজ , সেই মাটির ঘর , সেই গোবরের গন্ধ , সেই ভুট্টার স্বাদ , সেই গরম গরুর দুধ , সেই বিহুর আনন্দ , সেই মনসা পুজোর খাসি খেতে যাওয়া আর সবার ওপরে সেই সাধারণ আদিবাসী পরিবারগুলো আজও আমাকে টেনে নিয়ে যায় আমার স্বপ্নের শহর চিত্তরঞ্জন । 

৭৩ এর এই তিনটি জিনিস ছাড়াও যেটা আমার খুব মনে পড়ে সেটা হল ৭৩ এর গাছ , পাখি ও সবচেয়ে বেশি ছেলেবেলার দিনগুলো । ছট থেকে দোল , ঈদ থেকে ক্রিস্টমাস এই শহর সবার সাথে মিলে উৎসবে মেতে উঠতো বারবার আর এই ৭০ , ৭১ ও ৭৩ আমার কাছে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় স্বাক্ষী । এখানকার মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ আজও মনকে ভীষন টানে । আর এই সব অভিজ্ঞতা নিয়েই তো স্বপ্নের শহর নির্মাণ হয় ।

আমার কোয়ার্টার থেকে ছেড়ে আসা একদিক আজ ঘুরে এসে মন বেশ ভারাক্রান্ত । তাই বাড়ি ঢুকে পড়বার কোন চান্স নেই এখন । বরং ওভালের দিকটা যেটুকু বাকি ছিল সেখান থেকে আবার একবার ঘুরে আসা যাক । আর ফেরার পথে সানসেট এভিনিউ এর মহুয়ার বুক চিরে দেখে নেব সূর্যাস্তের লাল মুখখানা । তাহলে চলুন , লেটস গো ।



( চলবে )

Monday, 8 June 2020

ভারত , নারী , সমাজ এবং .....



ভারতীয় ইতিহাস বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ইতিহাসের মধ্যে অন্যতম । সিন্ধু সভ্যতার হাত ধরে যে ইতিহাসের ধারা প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল তা আজও অক্ষত । তবে সময়ের সাথে সাথে ভারতীয় সমাজে পুরুষতন্ত্রের যে প্রাধান্য দেখা গেছে তা ভারতের ইতিহাস থেকে অনেকটাই ভিন্ন । যে দেশ লক্ষ্মী , সরস্বতী , দুর্গা , কালি , দশমহাবিদ্যার উপাসনা করে থাকে , সেই দেশেই আজ কন্যারা সর্বাধিক বিপদে । রাস্তার অন্ধকারে ধর্ষণ আজ প্রতি দিনের ঘটনা । কন্যা ভ্রূণ হত্যার ফলে লিঙ্গ অনুপাত হ্রাস পেয়েছে এই সমাজে । অথচ এই দেশের গৌরবান্বিত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে , নারীদের স্থান এই সমাজে কত উন্নত ছিল ।
আজ এই ইতিহাসের দিকেই আপনাদের দৃষ্টি ফেলতেই আমার এই প্রচেষ্টা :-

আর্য সমাজ :- আর্যদের যুগে মহিলাদের দেবী হিসাবে স্থান দেওয়া হয় । গার্গী , মৈত্রী , লোপামুদ্রা , খনার নাম আজ জগৎ খ্যাত । পুরুষদের পাশাপাশি এই সমস্ত নারীরাও ভারতের ইতিহাসে যে অবদান রেখে গেছে তা সত্যই প্রশংসনীয় ।

“Nijabhujadanda nipatitakhanda
Vipatitamunda bhataadhipate
Jaya Jaya he Mahisasuramardini ramya
Kapardini shailasute " .....

মা দুর্গার ওপর রচিত এই শ্লোকে তার বীরত্ব আমরা দেখতে পাই যেখানে তিনি একাই শত শত যোদ্ধাকে নাশ করছেন । নারীদের দক্ষতার এরকম হাজার হাজার লক্ষ্য করা গেছে সে যুগের লেখাতে । বাস্তবেও নারীদের হাতেই তাই সমস্ত ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছিল তখন ।
দুর্গা বা কালি ছেড়ে এবার রামায়ন ও মহাভারতে ফিরে আসা যাক । সেখানে আমরা বেশ কিছু নারী চরিত্র দেখতে পাই যাদের বাদ দিয়ে মহাকাব্য দুটি কল্পনাও করা যায় না । তাদের বীরত্ব পাঠকের চোখে এক অন্য সম্মানীয় স্থান দখল করে রেখেছে ।
লঙ্কিনী ও শৃখন্ডি চরিত্র দুটির কথা মনে পড়ে । যদিও দুজনেই ছিল পার্শ্ব চরিত্র তবু তাদের যুদ্ধ নিপুনতা বিষয়ে সকলের মনে বাহবা ছাড়া আর কোন শব্দ আসতে পারে না । কন্নড় ভাষায় রচিত জামিনী ভারতম গ্রন্থে  অর্জুনকে এক অচেনা দেশে আবির্ভূত হতে দেখতে পাই আমরা । সে দেশ অনেকটা গ্রিক আমাজনের মত , যেখানে প্রতিটি মহিলার মধ্যেই এক যুদ্ধং দেহি মনোভাব  । কাহিনী অনুসারে এখানের রাজকুমারী প্রমীলা , অর্জুনের অশ্বমেধের ঘোড়াটিকে বন্দি করে রেখেছিল এবং তারই জন্য অর্জুন সেই দেশে উপস্থিত হন ।  পরবর্তীতে অর্জুন প্রমিলাকে বিবাহ করতেও বাধ্য হন । ভেবে দেখুন , অনুভব করুন এই দেশের লাজুক নারীদের সাহসিকতা । এই দেশ ও সেখানকার নারীদের সাহসিকতার বর্ণনা আমরা গুরু মৎসেন্দ্রনাথ এবং গোরক্ষনাথের গল্পেও পেয়ে থাকি ।

সুতরাং , একটা কথা পরিষ্কার যে আর্য সভ্যতা ও প্রাক আর্য সভ্যতায় নারীদের সফলতা এবং সমাজে তাদের উন্নতির ছবি আমরা রন্দ্রে রন্দ্রে অনুভব করতেই পারি । আর এটা শুধু আর্য কাহিনীতেই নয় , ইতিহাসের প্রতি অধ্যায়ের মধ্যেই এই বীরত্ব আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে দেখতে পাই । বর্তমান সমাজ হয়তো নিজ দেশের সেই গৌরবান্বিত নারী ইতিহাস ভুলে গেছে ।

মৌর্য সাম্রাজ্য ও তার পরবর্তী ইতিহাস :-  মৌর্য সাম্রাজ্যে মহিলা দেহরক্ষী রাখা হতো , সেকথা ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই জানা যায় । সেই সমস্ত মহিলারা সুসাস্থ সম্পন্ন , কর্মঠ , নির্ভীক এবং যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ছিল । শুধু তাই নয় , সে যুগে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বেশি বিশ্বস্ত বলেও মনে করা হত আর তাই মহারাজ মহিলাদেরই এই বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে থাকতেন । যুদ্ধ ক্ষেত্রে মহিলারা সেবা ধর্ম যেমন নিপুণ কৌশলে সামলাতেন , ঠিক তেমনই প্রয়োজনে সরাসরি মাঠে নেমে যুদ্ধ করে থাকতেন আর এ জন্য তাদের ছোট বেলা থেকেই যুদ্ধ কৌশল শেখানো হতো ।
মধ্য যুগ থেকে সমাজ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে পিতৃ তান্ত্রিক আকার ধারন করলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহিলাদের সুযোগ কমে যেতে থাকে । তবে এসবের মধ্যেও যোগ্যতা নিজের পথ সব সময় তৈরি করে নিয়েছিল । একাদশ শতাব্দীতে ওয়ারঙ্গেলের মহারানী রুদ্রমা দেবী ছিলেন একজন শক্তিশালী যোদ্ধা । তিনি একটি শক্তিশালী সৈন্যদল নির্মাণ করেন এবং প্রতিটি সৈন্যকে মার্শাল আর্ট এর শিক্ষা প্রদান করেন । এর ফলে তার সাম্রাজ্য দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসাবে পরিচয় লাভ করেছিল । আজ আমরা মার্শাল আর্ট বলতে চীনকে চিনি , অথচ ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে আমাদেরই দেশে এই বিদ্যার প্রচলনের ইতিহাস । শুধু মার্শাল আর্ট নয় , রুদ্রমা দেবী মল্ল যুদ্ধ ও তরবারি ব্যবহারেও নিপুণ ছিলেন । তার এই শক্তিশালী সাম্রাজ্যের কাছে গঙ্গা বংশ এবং যাদব বংশ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল । শুধু রুদ্রমা নন , এই সময়ে সমগ্র দক্ষিণ ভারত বেশ কিছু শক্তিশালী রানীর উত্থান দেখেছিল -- যেমন মহারাণী আববাক্কা, যার শক্তির কাছে পর্তুগিজ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল ; মহারাণী কেলাডি চেননামমা , যিনি মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন । মারাঠারা পর্যন্ত তার শক্তি এবং সাহসিকতায় মুগদ্ধ হয় ; মহারাণী কিততুর চেননামমা , যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করে গেছিলেন ।
এরকম অসংখ্য বীর নারীদের দেশ আমার ভারত । তবু আজও নারী নির্যাতন ঘরে ঘরে , আজও মহিলা জন্ম মানেই অশুচি মনে করা , মহিলা মানেই ভ্রূণ হত্যা , মহিলা মানেই গৃহবন্দি জীবন । এখানেই এ ইতিহাস শেষ নয় । সারা ভারত খুঁজে দেখবো , কথা দিলাম । যতটা ইতিহাস তুলে আনা যায় , আনবো । যদি কিছুটা উপশম হয় কোনদিন ।

উত্তর ভারতীয় সমাজ :- দক্ষিণ থেকে ফিরে আসা যাক ভারতের অন্য প্রান্তে । রাজপুত সম্প্রদায়ের বীরত্বের ইতিহাস আমরা কে না জানি । তবে তার থেকেও উল্লেখযোগ্য হলো রাজপুত সমাজের মহিলাদের ইতিহাস । ভারতের সমগ্র জাতির মধ্যে রাজপুত মহিলারাই মাথা উঁচু করে বাঁচার কথা আমাদের শিখিয়েছিল বারবার । গোন্ডওয়ানার মহারানী বাজ বাহাদুর কে পরাস্ত করেছিল এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ওপর একক শক্তি নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল । অবশ্য শেষ রক্ষা হয় নি এবং একটি তীর চোখ বিদ্ধ করার ফলে মৃত্যু হয় তার ।
রাজপুত মহারানী পদ্মিনির বীরত্বের কাহিনী আমরা কে না জানি । আলাউদ্দিন খলজির হাত থেকে তার স্বামী রাওয়াল রতন সিং কে মুক্ত করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ।
গারওয়ালের নাক কাটি রানীর বীরত্বের কাহিনীও কারুর অজানা নয় । সেখানের রানী কর্ণাবতী শত্রুদের নাক কেটে দিত বলে জানা যায় । সুনিপুন অস্ত্র কৌশল না জানলে এটা কোনদিন সম্ভব নয় । দুন উপত্যকায় তিনি মুঘল বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণ একাই প্রতিহত করেছিলেন । বাঙলার রানী ভবশংকরি তার বীরত্বের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন । ভুরসূত অঞ্চলে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য তিনি একাই পাঠানদের প্রতিহত করেছিলেন । পশ্চিমের তারাবাই এর সাম্রাজ্য মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছে অভিশপ্ত হয়ে উঠেছিল । তিনি বহুবার তার সাম্রাজ্যে মুঘল আক্রমণ প্রতিহত করেন , এমনকি ঔরঙ্গজেবের বহু অঞ্চলে তার বিজয় পতাকার বীজ বপন করেছিলেন ।
ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধের ইতিহাসে মহিলা বীরত্বের অবদান কোনদিন কোনভাবেই খন্ডন করা যায় না । ১৮৫৭ র যুদ্ধের শহীদ লক্ষ্মীবাই ও ঝলকারী বাই , মেদিনীপুরের মাতঙ্গিনী হাজরা , প্রীতিলতা ওয়াদেদার হলো সেই সমস্ত ভারতীয় মহিলা যারা সম্মুখ সমরে শুধুমাত্র দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিল । ইতিহাসের পাতায় এই তালিকা সুদীর্ঘ । আস্তে আস্তে সবই আলোচিত হবে এখানে ।

ভারতীয় মুসলিম সমাজ :- ভারতীয় মুসলমান সমাজে পর্দা প্রথার মত অভিশাপ যেমন সত্য ছিল, ঠিক তেমনই সেই সমাজের মহিলাদের বীরত্ব এক অন্যতম সত্য বলে জানা যায় । সুলতানা রাজিয়ার নাম কে না জানে । ইলতুতমিস কন্যা রাজিয়া বেগম একজন দক্ষ ঘোড়সোয়ার ছিলেন এবং তার পাশাপাশি একজন সুদক্ষ যোদ্ধাও ছিলেন । বাবার মৃত্যুর পর তিনি দিল্লির মসনদে বসেন এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব সামলেছিলেন ।
জাহাঙ্গীর স্ত্রী নূর জাহান ছিলেন একজন বুদ্ধিমতী রমণী । সাম্রাজ্যের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জাহাঙ্গীর যেমন তার সাথে পরামর্শ করে থাকতেন তেমনই প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি রণ ক্ষেত্রে তার স্বামীর প্রাণ রক্ষাও করেছিলেন ।
আহমেদনগর সাম্রাজ্যের চাঁদ বিবির বীরত্বের কথা ইতিহাস আজও মনে রেখেছে । মুঘলদের সাথে যুদ্ধে তিনি নিজে রণক্ষেত্রে নেমে আসেন । যদিও সে যাত্রায় শেষ রক্ষা হয় নি ।
ঊনবিংশ শতকেও আমরা দেখতে পাই ভারতীয় মুসলমান মহিলারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছিল । তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বেগম হজরত মহল , আজিজুন বাঈ প্রভৃতি ।
শুধু রাজ পরিবার অথবা সম্ভ্রান্ত পরিবারে নয় , ভারতীয় সাধারণ মহিলাদের শক্তির কাহিনী ইতিহাসের পাতায় পাতায় ভরে আছে । আমরা আসলে ইতিহাস পড়ে গেছি চিরকাল , জানতে চাইনি কোনদিন । হামপি গুহাচিত্র এবং বেলুর গুহাচিত্রে মহিলাদের মল্লযুদ্ধে অংশগ্রহনের ছবি পাওয়া গেছে । এর থেকে পরিষ্কার যে ভারতীয় মহিলারা নানা রকম আত্মরক্ষা কৌশল জানতো এবং মার্শাল আর্টসের বিভিন্ন কলাকৌশল যেমন সিলাবাম ( লাঠিখেলা ), কুস্তি , কলারি প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান ছিল । তবে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে -- তারা কি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল কোনদিন । তার উত্তর অবশ্যই সদর্থক । আগামী পর্বে ভারতীয় সাধারণ মহিলাদেরই বীরত্বের ছবি তুলে ধরবো আপনাদের সামনে ।


ভারতীয় সাধারণ মহিলা সমাজ :- আগেই বলে এসেছি ভারতীয় মহারানী শুধু নয় সাধারণ ঘরের মহিলাদের বীরত্বের গল্প এদেশের পাতায় পাতায় রয়েছে অমর হয়ে । আমরা হয়তো সেসব জানার চেষ্টা করি নি , অথবা এই সমাজ সেসব জানতে দেয়নি । ওনাকে ওববাভা হায়দার আলীর সাথে লড়াই করে তার প্রায় একশত সৈন্য একাই হত্যা করেছিলেন । মল্ল যুদ্ধে বহু ভারতীয় মহিলা ভারতীয় মহারাজদের কুপোকাত করেছেন এমন নিদর্শন বহু শিলালেখ থেকে আমরা জানতে পেরে থাকি ।


বর্তমান সভ্যতায় নারীদের অবস্থা

বর্তমানে আমরা উন্নতির দিকে যত এগিয়েছি তত মহিলা সুরক্ষা নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা করছি । তবু প্রশ্ন থেকে যায় আজ সত্যিই মহিলারা সুরক্ষিত তো ? প্রশ্ন থেকেই যায় আজও গভীর রাতে নারীরা পথে ঘাটে নিরাপদ তো ? নারীদের নিরাপত্তা যদি সত্যিই বেড়েছে তবে তাদের  সংরক্ষণের দাবি ওঠে কেন ?  রাজস্থানের এমন একটি জায়গা আছে যেখানে এখনো সহমরন প্রথা চালু আছে । গ্রামের দিকে , নারী জন্ম আজও কতটা অশুচি । আজও মাসিক হলে মেয়েদের পুজোর ঘরে ঢোকা নিষেধ । আর সবশেষে নিজের মাকে প্রশ্ন করে দেখুন বিয়ের মণ্ডপে বাবার পাশে তার বসার অধিকার আছে কি না ?
আসলে ছেলেদের পরিচালিত সমাজ ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী । তারা আসলে যাই করুক তাই ঠিক , মেয়েরা নয় । পুরান থেকে বর্তমান -- এই নিয়মেই বাঁধা । এ নিয়ে একদিন লিখবো । সেদিন হয়তো পুরুষদের চক্ষু শূল হবো । তবু লিখবো । পুরুষ সমাজ যে কত বড় অপরাধী তা না বললে অন্যায় হবে।

ভারতীয় মহিলা শক্তি পৃথিবীর চোখে শক্তির শুধু নয় , মুক্তি দিলে অনায়াসে সব ক্ষেত্রেই বাঁধ ভেঙে দিতে পারে । মহিলাদের মানসিক দক্ষতা তাকে বহু ক্ষেত্রেই এগিয়ে দিয়েছে । কিন্তু ওই যে পুরুষ শাসনের বেড়াজাল । ওই নিয়ম ভেঙে শত শতাংশ নারীমুক্তি সম্ভব হয় না । তবে একটা কথা বলাই যায় সমাজে প্রচলিত কথা , ' ন স্ত্রী স্বতন্ত্রমারহতি ' , বর্তমানে বহুক্ষেত্রেই ভুল প্রমাণিত ।

 সমাজ গঠনের প্রয়োজন মানুষ ঠিক কবে থেকে উপলব্ধি করলো তা বলতে না পারলেও , একটা কথা অনায়াসে বলাই যায় মানুষের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা মানুষকে সমাজ গঠনে বাধ্য করেছিল । এক বিখ্যাত ইংরেজি প্রবাদ অনুযায়ী , " Necessity is the mother of all invention " । সমাজও মানুষের কাছে এমনই এক প্রয়োজনীয় আবিষ্কার ছিল । তবে আজকের সমাজ ব্যবস্থা আর সমাজ ব্যবস্থার প্রথম ধাপটি কিন্তু মোটেই এক ছিল না । জঙ্গলে বসবাসকারি আদিম মানুষগুলো একে অপরের প্রয়োজনে সমাজ গঠন করে , ফলে সেই সমাজে এক সুন্দর সমন্বয় ছিল ; কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে ওঠে , ফলে সমাজের দাঁড়িপাল্লা হয়ে উঠতে শুরু করে একপেশি ।
সমাজ ব্যবস্থার দিকে আলোকপাত করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে সামাজিক বিভেদ শুধু ধর্মের ভিত্তিতে নয় , অর্থের ভিত্তিতে নয় , লিঙ্গের ভিত্তিতেও গড়ে উঠতে থাকে । আর এর মূলে ছিল পুরুষদের অবাধ ক্ষমতা পেয়ে যাওয়া । স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষমতা লোভের জন্ম দেয় এবং পুরুষেরা এই লোভের বশীভূত হয়ে নারীদের উপভোগ্য বস্তু বলে গড়ে তুলতে শুরু করে । নানা অছিলায় গার্গী মৈত্রীদের সমাজে নারীদের বন্দি হতে হয় চার দেওয়ালের মধ্যে । এক একটি দিক বোধহয় আলোচনা করলে বোধহয় ভালো হয় ---

আলোচনা ১ :- দুর্গা , কালি , জগদ্ধাত্রী , লক্ষ্মী , সরস্বতীর উপাসনা করা মানুষেরা কিন্তু ক্ষমতার দিক থেকে তাদের স্থান প্রদান করে নি । ভারতীয় পূরানে বর্ণিত এই মহিলাদের ক্ষমতাশীল হওয়া সত্বেও , স্বর্গ রাজ্যের অধিকার ইন্দ্রের হাতে এবং পৃথিবী পরিচালনা , সৃষ্টি তথা ধ্বংস তিন দেব -- ব্রহ্মহা , বিষ্ণু ও মহেশ্বরের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে । অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও লক্ষ করলেও একই ছবি দেখা যাবে । ইসলাম ধর্ম বোরখার আড়ালে মেয়েদের ক্ষমতা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল । গৌতম বুদ্ধ বিবাহিত হয়েও স্ত্রী কে একা ছেড়ে চলে আসে । খ্রিস্টান ধর্ম নারীদের উন্নতির কথা বললেও প্রধান ক্ষমতা কিন্তু একজন পুরুষদের হাতেই তুলে দিয়েছিল । আর জৈন ধর্ম নারী জন্মকেই পাপ বলে চিহ্নিত করেছিল এ কথা কে না জানে ।
অতএব এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট সামাজিক জীবেদের চিন্তা , ধ্যান , ধারণা আমাদের পুরান তথা ধর্মীয় গ্রন্থে পড়েছিল আর বিভিন্ন ধর্মীয় গুরু সেই ধারণার বীজ যুগ যুগান্তর ধরে আমাদের মধ্যে বপন করে চলে এসেছে ।


আলোচনা ২ :- আর্য সমাজে মেয়েদের এক বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো এ কথাও যেমন ঠিক , তেমনই  নারীদের বেশ্যা রূপটিও যে সমাজের তৈরি তা ভুললেও চলবে না । ইন্দ্র কে ক্ষমতায় আসীন যেমন করা হয়েছে , তেমনই রম্ভা , উর্বর্ষিদের নর্তকি হিসাবে ভারতীয় পুরানেই দেখানো হয়েছে । এই যে আসুরিক প্রবৃত্তি তা দেব , মানব , অসুর সকলের মধ্যেই যে বিরাজ করছে তা এখান থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে । তাদের চোখে নারীরা চিরকাল উপভোগের পণ্য হয়েই থেকে গেছে , একথা কে না বুঝতে পারে বলুন তো ?
অন্যদিকে এই বেশ্যা রূপ পুরুষদের মধ্যেও আদি কাল থেকেই বিরাজ করছে । দুঃখের বিষয় হলো ইতিহাস সে সব কোনদিন প্রকাশ করে না । এই ধরুন না , ছয় পান্ডবের জন্ম কাহিনীটাই । কুন্তীর বিবাহ বহির্ভূত যে সম্পর্ক তার ফলেই কর্ণ সমেত , পাঁচ পান্ডবের জন্ম হয় । কুন্তি সূর্য , বরুণ প্রভৃতি দেবতাদের সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েন এবং প্রেগনেন্ট হয়ে যান । আপনারা এ ক্ষেত্রেও কুন্তীর দোষ খুঁজতে ব্যস্ত নিশ্চই ? অথচ এই দেব গন মহাভারতের পাতায় যে ভূমিকা ছেড়ে গেছেন তা বর্তমান MSW (Male Sex Worker ) দের থেকে কোন কম কি ? অথচ তাদের এই ভূমিকাটি সমাজ খুব সহজেই চেপে দিয়েছেন , যেমন চেপে দেওয়া হল পুরুষ যৌন ক্রিয়া বর্তমান সমাজে । একটা কথা মনে রাখতে হবে , যা খারাপ তা সকলের জন্যই খারাপ হওয়া উচিত । তবে সব খারাপের দায় একলা নারীর হবে কেন ?

আলোচনা ৩ :- আজকে নারীদের প্রতি পুরুষ সমাজের একটু অন্য রকম দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবো । যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মে এই অত্যাচার নারীদের সহ্য করতে হয়েছিল । তার দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমাদের লজ্জিত নয় ব্যথিত হতে হয় । এই পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নারীদের সহজে পদ দেয়নি এটা যেমন ঠিক , তেমনই এই সমাজ নারীদের বারবার অত্যাচারের মুখে ঠেলে দিয়েছে । সীতাকে অগ্নি পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের সতিত্বর পরীক্ষা দিতে হয়েছে , কিন্তু রামকে তা দিতে হয়নি । গভীর জঙ্গলে রাম , লক্ষ্মণ ও সীতা আলাদা হয়ে পড়ার পর ঠিক কি ঘটেছিলো তা আমাদের সামনে সেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় নি । সেক্সের চাহিদা প্রাকৃতিক নিয়মে নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যে হয়ে থাকে । তা পূরণ করতে যদি সীতা উদ্যত হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়ে থাকে , তবে রাম বা লক্ষ্মণকেও এই একই দোষে সন্দেহ করা হবে না কেন বলতে পারেন ?
আলোচনাটিকে আরও একটু মিষ্টি ও গভীর করে তুলতে চলুন একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক । পুরান ও ধর্ম গ্রন্থগুলি যেহেতু আমাদের সমাজের আদী ইতিহাস বলে সমাদৃত হয় তাই এই গ্রন্থের ওপর নির্ভর করেই আমরা পুরুষদের কুকর্মলিপ্ত সমাজকে জানতে ও চিনতে চেষ্টা করবো ।
মুসলিম সমাজে মহিলাদের কতটা সম্মান দেওয়া হয়ে থাকে তা আমরা কম বেশি সকলেই জানি । পর্দা প্রথার নামে মেয়েদের বন্দি করে রাখা হয় । পর পুরুষের দৃষ্টি এড়াতে তাদের বোরখা পড়তে বলা হয় । ওহে মূর্খ , মেয়েদের কত সহজে উপেক্ষা করিস তোরা ! পুরুষের ক্ষেত্রে এমন নিয়ম কেন কার্যকর হবে না বলতে পারেন ? তারাও তাহলে অন্য মেয়েদের দৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারে । নাকি তাদের ক্ষেত্রে সাত খুন মাফ । অবশ্য যে ধর্ম মেয়েদের ঘরে বন্দি করতে চায় , পড়াশুনা করতে মানা করে , সমাজের মূল স্রোতে মিশতে দিতে চায় না তাদের কাছে এসব আসা করাও হাস্যকর । মালালার জীবনী এই বক্তব্যের সমর্থনে সবচেয়ে বড় প্রমান । সত্যি বলতে মুসলিম সমাজ মেয়েদের বাচ্চা উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করে তুলতে চেয়েছে । একের বেশি বিবাহ যা হিন্দু ধর্মেও লক্ষ করা গেছে তা মুসলিম ধর্মেরও প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ফুটে উঠেছে এর জন্মলগ্ন থেকে । আর এই বহু বিবাহের মূল উদ্দেশ্য প্রেম নয় , বরং সন্তান উৎপাদন, এটা বলতে কোন বাঁধা থাকতে পারে না ।  তাজ্জব না । তবে এই রীতি হিন্দু ধর্মেও দেখতে পাবেন । মুসলমান সমাজে মেয়েদের প্রতি অন্যায়ের আরও একটি দিক হলো তিন তালাক প্রথা এবং নিকাহ হালাল । এই প্রথম নিয়ম অনুযায়ী মুসলিম পরিবারে স্বামী নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নিজের স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে এবং তার জন্য কোন কোর্ট বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই তার । তালাক তালাক তালাক বলা হলেই স্বামী স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে দিতে পারেন । উল্টোটি কিন্তু সত্য নয় এক্ষেত্রে অর্থাৎ স্ত্রী স্বামীর ওপর শত অভিযোগ থাকলেও সেই বেচারি স্ত্রীর তালাক দেওয়ার কোনো অধিকার পুরুষ তাদের দেয় নি । এখন যদি সেই স্বামী তালাক দেওয়ার পর নিজের ভুল বুঝতে পারে তবে সমাজ মেয়েটিকে পুনর্বিবাহের যে নিয়ম রেখেছে তা সত্যিই এক অপমানের থেকে কম কিছু নয় ।
হালাল অনুযায়ী মেয়েটিকে অন্য কাউকে বিবাহ করে তালাক প্রাপ্ত হলে তবেই নিজের আগের স্বামীকে বিবাহ করার অধিকার ফেরত পাবে ।

সত্যিই কি বিচিত্র সমাজ সেলুকাস ! সত্যই মেয়েদের প্রতি তার বিচিত্র নিয়ম । অথচ পুরুষ সমাজের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলেও তাদের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম কার্যকর করে নি কেউ । ভাবো পুরুষ ভাবো আর তার পাশাপাশি এই বিস্বাস নিয়ে ভাবনা রেখো , মেয়েরা তোমাদের হাতের পুতুল নয় । অবশ্য এই অংশে মুসলমান সমাজকে তুলে ধরেছি শুধু । তবে বাকি সমাজের গভীরে ঢুকতে দিন । দেখবেন পুরুষতন্ত্রের এই আঁতুরঘর নারীদের কিভাবে বঞ্চিত রেখেছে , উপেক্ষিত করে এসেছে চিরটাকাল । বর্তমান সমাজেও এর পরিবর্তন হয় নি এক আনাও ।

বর্তমান বিশ্ব সমাজ গঠনের অন্যতম উপাদান হলো জৈন সমাজ । এই সমাজে নারীদের উপেক্ষা সর্বাধিক লক্ষণীয় । জৈন দের বিস্বাস অনুযায়ী মহিলা জন্ম পাপ ও অশুচি ময় । তাই তো স্বেতামবর রা মহিলাদের আশ্রমে প্রবেশ করতে দিত না । জৈন ধর্মগুরু মহাবীরের মত অনুযায়ী , "Women are the greatest temptation in the world. . . He should not speak of women, nor look at them, nor converse with them, nor claim them as his own, nor do their work" (Sacred Bookds of the East, vol. 22:48). ভাবুন তো কি সাংঘাতিক এই নীতি । আর আরও ভেবে দেখুন এই নীতি কার সৃষ্টি -- একজন পুরুষের । আচ্ছা ইনি সমাজ ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ করার কে ? যে ব্যক্তি পুরুষদের আপন করে নিতে পারেন , পুরুষদের কাছে টেনে নিতে পারেন অথচ এই সৃষ্টির সৃষ্টি যার দ্বারা ; তাকে সম্মান করতে পারেন না ; তিনি সমাজের নিয়ম নির্ধারণ করার অধিকারী হন কি করে ?

মহাবীরের কাছে মহিলারা নাকি সমস্ত পাপের উৎস । আর এ কথা তিনি নিজেই বলে গেছেন ; "He, Mahavira, to whom women were known as the causes of all sinful acts, . . . (ibid., vol. 22:81).

পুরুষদের এমন কুটিল নীতি দ্বারা মেয়েরা বারবার এভাবেই আঘাত পেয়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে । আরও অনেক ব্যাখ্যা করা বাকি থেকে গেছে যা আগামীর আলোচনায় তুলে ধরে দেখাবো যে পুরুষ ও পুরুষ সৃষ্ট সমাজের নিয়ম কতটা একচোখা । নারী প্রগতি নিয়ে সমাজের গোড়ায় অথবা ধর্মের পুঁথিতে হাজার হাজার গুঞ্জন শোনা গেলেও , বাস্তবে তারা নারীদের বন্দি করতে চেয়েছে নিজের মুঠোতে ।
এই তো আমাদের দোরোখা সমাজ যেখানে মেয়েদের জন্য বাল্য বিবাহ , সহ মরন , একাদশী , হালালা , তিন তালাক এর মত ঘৃণ্য নীতি প্রচলিত । আবার সেই মেয়েকেই এই সমাজ কি সুন্দর পুজো করে কুমারি হিসাবে ।
বিদ্যাসাগর , রামমোহনের মত কিছু পুরুষ মেয়েদের জন্য এগিয়ে এলেও অধিকাংশরাই নীরব । জানিনা তারা ভুলে যায় কেন --- ".... ওই কোমল স্তনের দুগ্ধ হতেই এই পুরুষ জাতির জন্ম " ।

প্রাচীন আদিবাসী সমাজে মহিলাদের স্থান

পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় পরিবার বলতে শুধু স্বামী , স্ত্রী ও সন্তান বোঝায় না । যুক্ত পারিবারিক নীতি মেনে বাউড়ি সমাজ আজও জীবিত আছে । এ সমাজে বাড়ির ছেলে মেয়েদের সন্তান সন্ততিরাও একই ছাদের নিচে বাস করে থাকে । ঘরজামাই হওয়া বাউড়িদের মধ্যে সাধারণ হলেও , বাবার সম্পত্তির ওপর মেয়ের কোন অধিকার নেই এ সমাজে । পৈতৃক সম্পত্তির একমাত্র অংশীদার বংশের ছেলে অথবা ছেলেরা ।
বিবাহের ক্ষেত্রে দেনা পাওনার রীতি এ সমাজে বর্তমান । সম্বন্ধ করানোর ক্ষেত্রে ঘটক এর উপস্থিতি লক্ষ করা যায় । প্রেম বিবাহ , আসুরিক বিবাহ , অথবা বউ বদলের প্রবণতাও এদের বিবাহের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য । তবে রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ এই সমাজে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ । তবে বিবাহের ক্ষেত্রে জাত ও গোত্র বিচার অবশ্যই করে নেওয়া হয় । মানব বিজ্ঞানী দত্তের অনুসন্ধান অনুযায়ী বাউড়িদের মধ্যে কিছু টোটেমিক গোত্রের উপস্থিতি ছিল , যেমন -- কুকুর , শাল , কচ্ছপ , নাগ প্রভৃতি । কুকুর গোত্র পশ্চিমবঙ্গীয় বাউড়িদের মধ্যে লক্ষ করা গেছে । প্রাচীন বাউড়ি সমাজে বহুবিবাহের প্রচলন লক্ষ করা গেছে তথা কম বয়সে বিবাহের প্রচলন প্রচন্ড ভাবে দেখা যেত বলেই জানা যায় । সাধারনত একজন বিবাহযোগ্য ছেলের বয়স ছিল ১০-২৫ এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৫-১৫ বছর । এছাড়াও বাউড়ি সমাজের বিবাহ ও অন্যান্য পারিবারিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে বিশ্লেষণ করলে কিছু তথ্য নজর কেড়ে নেয় আমাদের ---

১. কোন রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ প্রয়োজন হতো না ।
২. দেনাপাওনা তাদের বিবাহের একটি অঙ্গ ছিল ।
৩. সহমরন প্রথা তাদের সমাজে ছিল না ।
৪. স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা বিবাহের প্রচলন এ সমাজে বহুদিন ধরেই বিরাজমান ।
৫. বাউড়িদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা লক্ষ করা গেলেও , স্বামী স্ত্রী কে কোন প্রকার খোরপোষ দিতে বাধ্য নয় ।
৬. বিধবা বিবাহ করলে বা বিচ্ছেদের পর স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়ে করলে তাকে সাঙ্গা বলা হয় ।
৭. সমাজে পুরুষদের পাশাপাশি স্ত্রীর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লক্ষ করা যায় ।
৮. নিজের পছন্দের ছেলে বা মেয়ে না পেলে তারা বিবাহ করতে বাধ্য নয় ।
৯. স্ত্রী কে স্বামীর ঘর চালানোর জন্য সম্পূর্ণভাবে এই সমাজ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে থাকে ।
১০. অন্নপ্রাশন এর ব্যবস্থা থাকলেও সেখানেও ব্রাম্ভন এর কোন ভূমিকা থাকতো না ।
এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে বাউড়ি সমাজের প্রতি এক অন্য সম্মান মনের গভীরে অবশ্যই জেগে ওঠে । ভেবে দেখুন তো নারী স্বাধীনতার জন্য আমাদের সভ্য সমাজে কত আন্দোলন হয়ে গেছে এবং আজও হয়ে চলেছে । অথচ এ দেশের প্রকৃত বাসিন্দা যে আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হয়েও নারীদের কত স্বাধীনতা দিয়েছে । এর পরেও কি লজ্জা হবে না নিজেদের ওপর , বলুন ?

বর্তমান সমাজে মহিলাদের অবস্থান

বর্তমান সমাজে নারী পুরুষ সমান সমান বলে শুনে আসছি আমরা । নারীদের জন্য আইন , সংরক্ষণ প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হয়েছে সরকার দ্বারা । তবু , সমাজের মনোভাবের গভীরে গেলে কিছু জিনিস মনকে বড্ড নাড়া দেয় ।

কয়েকটি প্রশ্ন রাখছি তার ভিত্তিতে ---

১. রাধাকে কলঙ্কিনী বলা হয় -- কারন তিনি বিবাহিতা হয়েও পরপুরুষের সাথে প্রেম করেছিলেন । আচ্ছা প্রেমের কি কোন বাঁধন থাকতে পারে ?
যদি পারে বলুন দেখি  , তবে কৃষ্ণ কি স্বভাব দোষে দুষ্ট নয় ? শুধু পুরুষ ক্ষমতাশালী হওয়ায় তাকে কলঙ্ক পুরুষ বলা হয় না । আর হিসাব করে দেখুন , পুরুষতন্ত্রের নাম করে পুরুষরা ভালোবাসাকে নিজের মনের মত গড়ে নিয়েছেন যা কোনদিন সম্ভব নয় ।

২. আইন প্রণয়ন করলেই কি সমাজ মনে প্রানে সব মেনে নিয়েছে ? কোনদিন নয় । তাহলে নারীদের ওপর এত ধর্ষণ হতো না কোনদিন ।

৩. যতই চ্যাচান , নারী পুরুষ আজও সমান সমান নয় । বিশ্বাস হয় না । নিজের বিয়ের মঞ্চে বাবার জায়গায় মাকে বসিয়ে দেখুন । সব উত্তর পেয়ে যাবেন ।