Sunday, 12 July 2020

গল্প প্রবন্ধের গাছ

স্বাধীনতা দিবস ( প্রবন্ধ )
                             ---শেখ আসমত 

স্বাধীনতা দিবস আমাদের সবার জন্য একটি শুভ উপলক্ষ।। ভারতের জাতীয় জীবনের পরম আকাঙ্ক্ষিত ও  পবিত্রতম দিন| কত শত শহীদের রক্তে স্নান করে এবং বহু ব্যথা-বেদনার  স্মৃতি বহন করে, এই পবিত্রতম দিনটি  1947 সালের 15 ই আগস্টের স্মরণীয় প্রভাতে আমাদের জাতীয় জীবনে আবির্ভূত হয়েছিল| পরাধীনতার অন্ধকার অপসারিত করে 15 ই আগস্টের সেই শুভ প্রভাতে ভারত গগনে যে স্বাধীনতার শিশু সূর্য উদিত হয়েছিল, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে|

1757 সালের 23 শে জুন পলাশীর আম্রকুঞ্জে ভারতের যে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, দ্বি  শতাব্দীর অবসানে অম্লান গৌরবে সেদিন পুনরায় উদিত হয়| ভারতের এই দুই শতাব্দীর ইতিহাস তার নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস| পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ- বিভিন্ন সীমান্তে সে প্রতিরোধের ব্যূহ রচনা করেছে|

1857 সালের ভারতীয় সিপাহীদের সংহত স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যর্থ হলে নতুনতর সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হলো ভারত| রাজা রামমোহন রায়,  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মধুসূদন দত্ত, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ যে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন, তা জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে বিকশিত হয়ে উঠল| তারপর অসহযোগ এর অস্ত্র হাতে জাতীয় কংগ্রেসের পুরোধায়  এসে দাঁড়ালেন মহাত্মা গান্ধী| একদিকে অহিংস সংগ্রাম, অন্যদিকে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত বিপ্লবী দলের রক্তাক্ত সংগ্রাম| তার সর্বশেষ পরিণতি দেখা গেল একদিকে গান্ধীজীর ভারতছাড়ো আন্দোলনে, অন্যদিকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ  ফৌজ এর ভারত আক্রমনে |
তারপর ইংরেজকে ভারত ছাড়তে হলো| কিন্তু সে দিয়ে গেল এক সর্বস্বান্ত খন্ডিত ভারত| রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পর শুরু হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভের সংগ্রাম| সেই সংগ্রাম এখনো চলছে| সে সংগ্রাম আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সংগ্রাম| এই ক'বছরে যে অগ্রগতি হয়েছে তাতে আত্মসন্তুষ্টির কোন কারণ নেই| দারিদ্র্য অশিক্ষা অস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে ভারতের এই সংগ্রাম চলবেই| 15 ই আগস্ট সেই আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক|





হিন্দু

                      আবদুস সাত্তার বিশ্বাস

     দীপ আর সৌগত অন্তরঙ্গ দুই বন্ধু।বন্ধুত্বে তাদের কোনোদিন ফাটল ধরেনি।কিন্তু আজ হঠাৎ করে প্রবল ঝড়ে গাছের ডালপালা যেভাবে দুমড়েমুচড়ে ভেঙে পড়ে সেইভাবে তাদের বন্ধুত্ব ভেঙে পড়ল।দীপ যখন সৌগতকে বলল,"চলো সৌগত,একটা সিগারেট আছে দু-জনে খেয়ে আসি।"
    সৌগত তখন বলল,"না,যাবোনা।তোমার সিগারেট তুমি খাও গে।আমার খাওয়ার দরকার নেই।"
    সৌগতর এমন আচরণে দীপ বলল,"সে কি! খাবেনা কেন?কি হয়েছে?" 
    "যাই-ই হোক হয়েছে।তুমি আমাকে কথা বলবে না।"
    "কথা বলবো না!"দীপ অবাক হল।
    "না,বলবে না।"
   "কিন্তু,কেন?"দীপ জিজ্ঞেস করলে পরে সৌগত বলল,"তোমার সঙ্গে আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই।আমার সঙ্গেও তোমার আর সম্পর্ক নেই।তুমি আর আমার বন্ধু নও।আমিও আর তোমার বন্ধু নই।"সৌগত একেবারে দীপের মুখের উপর যখন কথা গুলো বলল তখন আর বন্ধুত্ব থাকে?থাকল না।ভেঙে পড়ল।ফলে বন্ধুত্ব ভেঙে পড়ার বেদনায় দীপের মন খারাপ হল।এবং তার চোখে জল চলে এল।পরে দীপ চোখের জল মুছে বলল,"বেশ,কথা বলবো না।"
     "হ‍্যাঁ,বলোনা।"কিন্তু সৌগতর মনে কোনো কষ্ট নেই।আঘাত যে দেয় তার তো মনে কোনো কষ্ট থাকে না।আঘাত যে পায় কষ্ট তার হয়।ফলে সৌগতর চোখে,মুখেও মন খারাপের তেমন কোনো ছাপ দেখা গেল না।বরং সে বলল,"তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে।"
     শুনে দীপ তো বিস্ময়ে হতবাক।তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে!দীপ এতে থেকে আরো বেশি ব‍্যথা পেল।এবং পরে সে যখন কি ক্ষতি হয়েছে জানতে চাইল সৌগত তখন বলল যে,দীপ তাদের ঠকিয়েছে।সে তাদের ব‍্যাপক ক্ষতি করেছে।ফলে দীপের সঙ্গে তারা আর মিশবে না। দীপও যেন তাদের সঙ্গে আর না মিশে।কোনোদিন না মিশে।কিন্তু কিভাবে ক্ষতি করেছে সেটা বলল না।

                                 দুই

     কোনো কিছুই এমনি এমনি ভেঙে পড়ে না। ভেঙে পড়ার পিছনে অবশ্যই কারণ থাকে।তাদের বন্ধুত্ব ভেঙে পড়ার পিছনেও নিশ্চয়ই কোনো কারণ রয়েছে।সৌগত সেটা জানে।দীপকে বলেনি।যে করে হোক দীপকে সেটা জানতে হবে। জানতেই হবে।

                                  তিন

     কামিনী সৌগতর লাভার।দীপের সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে।কেননা দীপ একবার তার উপকার করেছিল।বড় একটা উপকার।কামিনীর মায়ের তখন অসুখ হয়েছিল।কি একটা অসুখ। কামিনী হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। ডাক্তার অপারেশন করতে হবে এবং ব্লাড লাগবে বলেছিল।কামিনী ব্লাডের জন্য ছোটাছুটি করেছিল।অনেক ছোটাছুটি।করেও সে কোত্থাও থেকে ব্লাড আনতে পেরেছিল না।সেকথা সে তার সকল আত্মীয়স্বজনকে জানিয়েছিল।জানানোর পর তারা সবাই ব্লাড দিতে ছুটে এসেছিল। কিন্তু বিধি বাম হলে যা হয়।কামিনীর মায়ের ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে কারও ব্লাডগ্রুপ মিলেছিল না। কারও না।একজনেরও না।শুধু কামিনীর ব্লাডগ্রুপ মিলেছিল।কিন্তু ডাক্তার তার শরীরে রক্ত কম বলে ব্লাড নিয়েছিল না।ফলে কামিনী হাসপাতালের বাইরে গাছতলায় মন খারাপ করে বসে ভাবছিল। ভাবছিল আর ভাবছিল।শুধু ভাবছিল।ভাবনা তার শেষ হচ্ছিল না।দীপ ওইসময় হাসপাতালেই ছিল।নার্সিং কোয়ার্টারের দিকে।ওখান থেকে কামিনীকে দেখে সে চিনতে পেরেছিল।পেরে কামিনীর কাছে এসেছিল।----"কামিনী,তুমি!"
      "মা হাসপাতালে ভর্তি আছে।"কামিনী বলেছিল।তারপর দীপকে জিজ্ঞেস করেছিল,"তুমি?"
     "আমার মা এই হাসপাতালের নার্স।মায়ের সঙ্গে একটু দেখা করতে এসেছিলাম।দেখা করে এখন বেরিয়ে যাচ্ছি।"দীপ বলেছিল।
    "তাই নাকি!"শুনে কামিনী আনন্দিতা হয়েছিল। ও বলেছিল,"তোমার মাকে আমার কথাটা একটু বলে দিও।তাহলে মায়ের দেখাশোনাটা ভালো হবে।"
     "সে বলে দেবো।"বলে দীপ বলেছিল,"এখানেই আমাদের বাড়ি।চলো না আমাদের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসবে!'
     কামিনী বলেছিল,"মনের অবস্থা ভালো নেই, যাবোনা।"
     দীপ তখন শুধিয়েছিল,"মাসিমার অবস্থা এখন কেমন?"
     কামিনী কাঁদো কাঁদো হয়েছিল,"খুব একটা ভালো না।"
     "কি অসুখ?" 
     "অসুখের নাম জানি না।"
     "অসুবিধা?"
     "ব্লিডিং,পেটে ব‍্যথা।"
     "ডাক্তার কি বলছে?"
     "অপারেশন করতে হবে।এবং ব্লাড লাগবে।"
     "ব্লাড পাচ্ছ না?"
     "না।কোত্থাও পাচ্ছি না।"
     "ব্লাড দেওয়ার মতো তোমার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই?"
     "আছে।সবাই এসেছিল।কিন্তু---"
     "কিন্তু কি?"
     "মায়ের ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে কারও ব্লাডগ্রুপ মিলল না।"
     "তোমার?"
     "আমার মিলল।কিন্তু শরীরে রক্ত কম বলে ডাক্তার আমার রক্ত নিল না।"
     "এখন কি করবে তাহলে?"
     "নির্জন গাছতলায় বসে সেটাই ভাবছি।এখন কি করবো।যত ভাবনা হয়েছে সব আমার।বাবা থাকলে এত ভাবনা হতো না।বাবা সব সামলে নিত।মাথার উপর কেউ নেই তো।"
     "তার মানে!"
     "বাবা বেঁচে নেই,মারা গেছে।"
     "দাদা?"
     "দাদা নেই।আমি প্রথম।একটা ভাই আছে। ছোট।সে আর কি করবে?"
     কামিনীর কথাগুলো শুনে দীপের মনে ব‍্যথা লেগেছিল।এবং মায়া হয়েছিল।খুব মায়া। কামিনীর জন্য সে তখন কিছু করতে চেয়েছিল। বলেছিল,"ব্লাডের জন্য তোমাকে কিছু চিন্তা করতে হবেনা,কামিনী।আমি ব্লাডের ব‍্যবস্থা করে দিচ্ছি। চলো,ভিতরে যাই। মাসিমা কোন বেডে আছে গিয়ে দেখি।"কামিনীর সঙ্গে দীপ ভিতরে এসে দেখেছিল ফিমেল ওয়ার্ডের বাইশ নম্বর বেডে রয়েছে।দুই হাতে দুটো স‍্যালাইন চলছে।মড়ার মতো পড়ে রয়েছে।দেখে দীপের চোখ দুটি ভিজে গিয়েছিল।ব্লাডের সে ব‍্যবস্থা করতে পারবে।কিন্তু পেশেন্টের যা অবস্থা এই মুহূর্তে ব্লাড লাগবে। নাহলে যখন তখন মারা যেতে পারে।সুতরাং দীপ ব্লাডের ব‍্যবস্থা না করে নিজে ব্লাড দিয়েছিল।তার ব্লাডগ্রুপ কামিনীর মায়ের ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।দীপের শরীর স্বাস্থ্য বরাবরই ভালো। তখনও ভালো ছিল।ছোট থেকে খেলাধুলা করে আর খাওয়া দাওয়া ঠিকঠাক করে তো।ফলে ডাক্তার তার শরীর থেকে যতটা ব্লাড প্রয়োজন সবটুকু নিয়েছিল।কামিনীর মা তারপর বেঁচে গিয়েছিল।সেই থেকে কামিনীর সঙ্গে দীপের সম্পর্ক।তবে সেটা ভালোবাসার সম্পর্ক নয়। উপকারিতার সম্পর্ক।ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সুতরাং দীপের বিশ্বাস যে,কামিনীকে ধরলে পরে সে সেটা জানতে পারে।সৌগত নিশ্চয় কামিনীকে বলবে।না বললেও সৌগতর কাছ থেকে কামিনী জেনে নিয়ে পরে সে সেটা তাকে জানাতে পারবে।

                                চার

      অতএব দীপ কামিনীকে ধরল।তবে সেটা কলেজে নয়।যদিও সে কলেজে ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু দুদিন থেকে কামিনী কলেজ আসছে না।কি যে হয়েছে কলেজ আসছে না।বাধ্য হয়ে দীপ তাকে ফোনে ধরল।তা-ও আবার কয়েকবার চেষ্টার পরে। প্রথমবার রিং করে করে কেটে গেলে দ্বিতীয়বার কল করল।সেবারও রিং করে করে কেটে গেল। তৃতীয় বারও কেটে গেল।অর্থাৎ পরপর তিনবার রিং করে করে কেটে যাওয়ার পর চতুর্থ বারের বেলায় দীপ কামিনীকে ফোনে পেল।পেয়ে বলল,"কি ব‍্যাপার,ফোন ধরছ না কেন?"
    কামিনী বলল,"তোমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করেছে।"
    "কে?"
    "সৌগত?"
    "কেন নিষেধ করেছে?"
    "তুমি আমাদের ঠকিয়েছ।তাই।"
    "আশ্চর্য!আমি কি করে তোমাদের ঠকালাম?"
    "তুমি হিন্দু নও।অথচ হিন্দু সেজে আমাদের সঙ্গে মিশেছ।এটা কি ঠকানো নয়?তোমার সত্য পরিচয় গোপন না রাখলে কি হতো!আমরা তোমাকে বন্ধু বলে গ্রহণ করতাম না?তোমার সঙ্গে মিশতাম না?নিশ্চয়ই মিশতাম।তাহলে এত পরিচয় লুকানোর দরকার কি ছিল শুনি!"
     "আমার সত্য পরিচয় কোনটা বলছ?"
     "তুমি হিন্দু নও।এটাই তোমার সত্য পরিচয়।"
     "আমি হিন্দু নই তুমি জানো?"
     "তুমি হিন্দু?"
     "তো হিন্দু নই!আমি হিন্দু!আমার বাবা হিন্দু! আমার মা হিন্দু!আমার ঠাকুরদা হিন্দু!আমার পূর্ব পুরুষরা প্রত‍্যেকে হিন্দু!শুধু নামে হিন্দু নয়।সব কিছুতে হিন্দু!আর আমাকে হিন্দু নও বললে আমি মেনে নেবো?কক্ষনো মানবো না।এতে যদি মরতে হয় মরবো!
    "তুমি হিন্দু তো তোমার পুরুষাঙ্গ তাহলে কাটা কেন?"
    "সে কাটা থাকতেই পারে।কত হিন্দুরই পুরুষাঙ্গ কাটা আছে।"
    "তুমি দেখেছ?"
    "না দেখে এমনি বলছি?যদি তুমি দেখতে চাও তোমাকেও দেখাতে পারি।ছোটবেলায় লিঙ্গের নানান সমস্যার কারণে তাদের পুরুষাঙ্গ কাটা পড়ে গেছে।বলো দেখবে কি?"
     "তুমি বেশি করে দেখো গে।আমার দেখার দরকার নেই।"
    "দেখবেনা তো বলছ যে?আচ্ছা,আমার যে পুরুষাঙ্গ কাটা তুমি সেটা জানলে কি করে?তুমি তো মেয়েছেলে।"
     "সৌগত বলেছে।"
     "কি বলেছে?"
     "তোমার পুরুষাঙ্গ কাটা।"
     "সৌগত জানল কি করে?"
     "কেন,তুমি আর সৌগত একদিন একসঙ্গে প্রস্রাব ফিরতে গিয়েছিলে না?সেদিন দেখেছে।"
     "তাই বুঝি!"
     "হ‍্যাঁ।"
     "আর এই জন্যই তোমরা দু-জনে-----"
      "হ‍্যাঁ।"কামিনী সত্যি কথাটা বলল।
      দীপ তখন বলল,"তোমরা দু-জনে এ ব‍্যাপারে আমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা তো করতে পারতে যে,এটা আমার এরকম কেন?জিজ্ঞাসা না করে তোমরা আমার সঙ্গে কি নীচ ব‍্যবহার করলে!"
      কামিনী বলল,"মনে ছিল না।এখন বলো।"
     দীপ তখন বলল যে,আজ থেকে বছর সাতেক আগে তার লিঙ্গের মাথায় একটা ছোট ফুসকুড়ি হয়েছিল।সেই থেকে বড় রকমের ইনফেকশন হয়ে গিয়েছিল।ফলে পেচ্ছাপ করতে গেলে খুব জ্বালা যন্ত্রণা হতো।ওষুধ খেয়ে সেরেছিল না।ডক্টর ঘোষ তখন ওটা ছেটে দেয়।সেই রিপোর্ট তার কাছে এখনও আছে।দেখতে চাইলে সে দেখাতে পারে। 
     কিন্তু কামিনী সেটা বিশ্বাস করল না।সব তার বানানো গল্প বলে দিল।দীপও ছাড়লো না।অনর্গল সে বলতে লাগল,"তোরা বিশ্বাস কর বা না কর আমি হিন্দু।হ‍্যাঁ,আমি হিন্দু।দুর্গা,কালী,লক্ষ্মী,সরস্বতী এরা সবাই আমার আরাধ‍্যা।...আমি হিন্দু!আমি হিন্দু!..এরা সবাই জানে,আমি হিন্দু!আমি হিন্দু!..."




আমার বইপাড়া*


                   ~  সায়ন্তী সামুই



'একলা দিনে একলা আমি,
তোমার সাথ ছিল ভীষন দামি।
আজ তো তুমি অধরা মুঠোফোনে,
বন্দি শুধুই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিফ্রেমে।'

'বই' শব্দটা যতটা না মনকাড়ে তার থেকে বেশি মন কাড়ে নতুন বইয়ের গন্ধ বা গল্পের বই। ছোটোবেলায় গল্পের বই খুব পড়লেও সুপ্ত ভালোবাসা ছিল। কলকাতার বইপাড়ার কথা শুনতাম, শূধু বুঝতাম অনেক বই পাওয়া যায়, মনে মনে ভাবতাম একদিন যাবো বড় হয়ে। মেলায় কেনা বা উপহারে পাওয়া গল্পের বই পড়া অবসরে,এটা নিয়েই কাটল ঘরবন্দি শৈশব। 
উচ্চমাধ্যমিক -এর পর কলেজে যাওয়া,একটু স্বাধীন জীবন, কলকাতার কলেজ স্ট্রিট -এ বইপাড়ার কথা শুনে মনস্থির করলাম যাওয়ার কথা। আমার শ্রদ্ধেয় এক স্যার -এর সংস্পর্শে এসে বই প্রেম আরও বেড়ে গেল, ঠিক করলাম যাবোই ওখানে। পরিস্থিতির কারণে যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। 
দুর্যোগের কারণে বইপাড়ার ক্ষতির কথা শুনে বুকটা ভেঙে গেলো। শৈশবের স্বপ্ন আমার বইপাড়া। পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করে ভেবেছিলাম স্বপ্নের বইপাড়া যাবো। আর হয়তো আমার স্বপ্নের বইপাড়াকে পাবো না। আমার এক বন্ধুর পরামর্শে আজ কিছুকথা আর স্মৃতি নিয়ে আমার স্বপ্নের বইপাড়ার কিছু কথা। অনুতপ্ত মন আজও বলে ―

    ' বইপাড়া' তুমি স্বপ্নে ছিলে,
     স্বপ্নশেষে, স্মৃতিতে রয়ে গেলে।

গুচ্ছ কবিতা

তুমি পুরুষ তুমি নারী 
 
জন্মসুত্রে
 

তোমার পরিচয় তুমি মানুষ
যদিও লিঙ্গসুত্রে

তুমি নারী তুমি পুরুষ
নারী-পুরুষ ঈশ্বরের দৃষ্টিপাতে বিচক্ষণ 
 সমান
মানুষের কাছে লিঙ্গ প্রধান সৃষ্টির ভিন্ন ব্যবধান
   
নারীর শরীরের শালীনে পুরুষের উৎকৃষ্ট অধিবাস
  
নারীর হৃদয় ইরাদা মননে পুরুষ হৃতপিণ্ডের শ্বাস
  
পাতার দুই পৃষ্ঠা
ভালোবাসা নিষ্ঠা
নারীর ঘন সুখ পেতে
 কারণে অকারণে
পুরুষ মরিয়া
 নারীর গহনে উত্থান পতন নারীর দহনে 

 
নারীর শান্ত শরীরে
    পুরুষের আহ্লাদীর দুষ্টু হাত
শীতের মাঝখানে নারীর বুকে পুরুষ কুঁকড়ে রাত  
নারীর গর্ভে জন্ম পুরুষ বিশেষণ
লালন পালনে নারীর ধর্ম জেনে পুরুষ নিশ্চিন্ত নির্বিকার

 
এলোমেলো বিছানা যেমন তেমন রাখা
মানে পুরুষের অভ্যাস

সকালের বিছানা ঘরদোর 
 অগোছালো
মানে নারীর অসভ্যতা

 
মিথ্যে মিশাল
পুরুষ নাকি শুধুই উপার্জন
নারী শরীর চর্চার 
 উদাহরণ  
পুরুষ
 চরিত্রহীন   নারীর কারণ 

নারী চরিত্রহীনা পুরুষের কারণ

শরীরের বাঁকে বাঁকে আনন্দ মাখ স্নান।

 

পুরুষের মন্বন্তরে নারী সুলগ্ন সবুজ প্রান্তর

নারী সময়ের নির্যাতনে পুরুষ বুকে আস্থার

নিঃশ্বাস ।

পুরুষের দুহাত তীক্ষ্ণ অসি নারীর প্রেরণায়

নারী দুর্গা চণ্ডী লক্ষ্মী সরস্বতী মঙ্গল কামনায় 



নারী 

ব্যাবহার করা নষ্ট জিনিষ যত্ন করে তুলে আনে
মায়া যন্ত্রণা ভালোবাসা নিজের সংসারের টানে
। 
পুরুষ

নারীর মূল্যায়ন জানে 

নারীর অধ্যায়ন মানে 

আগলে জীবনের উদ্যানে

নারীর চোখের নীচে লজ্জার ধর্ষণ

 
সার্থক
 জীবনযাপন
নারীর আলিঙ্গন নারীর চুম্বন
পুরুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজন
 । 
দেহের খিদে পেটের খিদে
  
নারী সযত্নে পুরুষের আয়োজন

 
যুগে যুগে ঘুম ভাঙিয়ে   
কেন বলি নারী শুধু ভোগ্য পুরুষ
 নারীর কচি গন্ধ পেলে
পুরুষ আরো বেশি নগ্ন নারীর নগ্নতা গতরে গতর ফেলে
।  
ধ্বংসের ঝলসানি নির্বীজ পাথরে মোমের আলো জ্বেলে ?

 

পুরুষ মুঠোয় ভরে 
নারীর সিঁথিতে সিঁদুর কপালে চন্দনের ফোঁটা
নারীর প্রেমে ভিখারি সাদর নারীর চাদর গোটা 
  
নারী-পুরুষ  সর্বাঙ্গে   সংসারের দালান কোঠা


পৃথিবীর শেষ প্রান্তিক 
 যেখানে পুরুষ দাঁড়িয়ে
স্বর্গের
 আন্তরিক নারী যেখানে দুহাত বাড়িয়ে ।
তুমি পুরুষ ভালো থেকো
 

তুমি  নারী ভালো থেকো 

এক দু'জনের নিস্তারে বিছিয়ে রেখো সংরাগের পরাগ।  

 

নারী পুরষের অবলম্বন
পুরুষ নারীর অবলম্বন
 
ভালোবাসা আঁকড়ে  হৃদয় ভরা যাপন
 । 

পুরুষ   খুলে দেখতে ভালোবাসে  
নারীর সংরক্ষণ
 ।
নারী গর্ভে যত্ন করতে ভালোবাসে
পুরুষ বীর্যক্ষরণ ।
*** 
 

বিকাশ দাস 

কবিতার কচিপাতা ৫

জয় 

কোয়েল 

জয়, 
আমি রাজকুমারী বলছি। 
সেই রাজকুমারী যার রাজত্ব টা বোধহয় তোমার উপর! 
হয়তো সেই রাজত্ব হারাবে, আবার সব ধূলিসাৎ হবে, নতুন রাজত্ব তৈরি হবে। 
তবুও তুমি এত দূরত্ব পার করে এসেছে। 
অদ্ভূত ভাবে এসেছ। 
জানো??
যখন আর আমার কিচ্ছু দেওয়ার মত নেই, 
যখন আমি নিস্তব্ধ, শান্ত, গুমট হয়ে বসে থাকা মেঘের মত শুধু গর্জে উঠছিলাম বারবার, 
তখনই তুমি এসেছ।।
শান্ত বাতাসের মতো কালো অন্ধকার কাটিয়ে নিয়ে গিয়ে আমাকে শান্ত করেছো, 
হাত ধরেছ, সাহস দিয়েছ । 
যদিও সবাই দেয়! 
তবুও তুমি আলাদা।
কারণ তুমি আমাকে চিনে তারপর আমাকে কাছে টানো নি
বরং কাছে টেনে নিয়ে তারপর আমাকে চিনেছিলে।
ধন্যবাদ বন্ধু।



অসুখ।।
সমাজ বসু

মানুষের আজ গাছের কথা মনে পড়ে না,
পাখি কিংবা---
                    নদীর কথাও।
তাই ভুলে যাওয়া সংক্রমণে আক্রান্ত মানুষের ছায়া থেকে
ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে তারা---
আর এভাবেই---
গাছ,পাখি আর নদীর বিরহে জনপদ ভাঙতে ভাঙতে আড়াল করে,
মানুষের সুখ।




বিষাক্ত
কলমে - অন্বেষা মন্ডল

পৃথিবী আজ ধূসর-একরাশ  বিষাক্ত ধোঁয়ায়,
মনুষ্যত্ব বোধ হারিয়ে গেছে,বিবেক বড় অসহায়।
লোভ,হিংসে,মারামারি, দ্বন্দ্ব -
জীবন ভুলেছে সঠিক বাঁচার ছন্দ।
এখন তোমার আমার মাঝে অনিশ্চয়তা জাগে,
একটু খানি ছোঁয়ায় মনে আতঙ্ক লাগে।
আজও অবোধ কুঁড়ি মাতৃগর্ভে শেষ হয়,
রক্ত মাখা মাংসপিন্ড- পৈশাচিক জয়।


পৃথিবী আজ ধূসর -একরাশ কালো ধোঁয়ায়,
মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যাচ্ছে,বিবেক বড় অসহায়।
যত্ন করে বাঁচিয়ে যারা রাখে,
সেই জিয়ন কাঠি ডুবছে মরণ পাঁকে।
প্রকৃতিমা ডুকরে কাঁদে, টলেনা তবু শক্ত পাষাণ,
শোনার অনিচ্ছায় অন্ধ চোখ,বন্ধ কান।
শিল্পের মোহিনী জালে জড়িয়ে,
ধ্বংসলীলায় মত্ত, যাচ্ছে সব মাত্রা ছাড়িয়ে।

পৃথিবী আজ ধূসর-একরাশ বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায়,
মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যাচ্ছে, বিবেক বড় অসহায়।
ক্ষমতার লোভ - শ্রেষ্টত্বের নেশায় ,
মেতে উঠেছে কুটিল পাশা খেলায়।
এরা অমানুষ - এরা সব পারে,
অন্য প্রাণীদের পায়ের তলায় পিষে মারে।
অট্টহাসির উন্মাদনায়,
সব ভুলে যায়,নিজেদের অস্তিত্ব হারায়।

অপরাধের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে,
 বিশ্ব - প্রকৃতি অনেকবার সতর্ক করেছে।
বিন্দু মাত্র ভয় পায়নি,
থামতে এরা সেখেনি।
আরও বিভৎস রূপ দেখিয়েছে,
নির্লজ্জের  মতো পাপের পথে হেঁটেছে।
পৃথিবী আজ ধূসর - একরাশ বিষাক্ত ধোঁয়ায়,
মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যাচ্ছে, বিবেক বড় অসহায়।





অগাণিতিক দৃশ্যসমূহ

স্বপঞ্জয় চৌধুরী

 

শূন্যে পেতেছি বোধের জাল

এখানে ধৃত হচ্ছে আলপিন, কালি,

দৈনিক বাজারী ফর্দ

ধৃত হচ্ছে কিছু ফিসফিস শব্দ

অব্যক্ত কানাকানি আর লোমহর্ষক গল্পের খাতা

শূন্যে পেতেছি সংখ্যার যোজন বিয়োজন

পীথাগোরাসের এক ও শূন্যের নীতি

এক হচ্ছে সংখ্যার ঈশ্বর আর শূন্য হচ্ছে দ্বিধাযুক্ত ভ্রষ্টতা

আংগুলে মাখন মেখে পিঁপড়ে ডেকে আনা যায়

পোড়া রুটির ছবি দেখিয়ে আঁকা যায় মানবিক কঙ্কাল।

অন্ধ পথ চলে পা গুনে গুনে সেও টের পায় জালনোট

আর সমুখে গর্তের সন্ধান।

সূর্যের আলো দেখে যে পথিক চোখে দেয় হাত

এ পথ তার জন্য নয় সে বরং গর্তের শীতল ঘোরে

ঘুমিয়ে থাকুক অনাদিকাল।




পথ
--চিরঞ্জিৎ বৈরাগী

খাতাগুলো ছিঁড়লেও
অগোচরে থেকে যাবে একশোভাগ হিসেব

তোমার থেকেই অন্যতুমি
মনে রেখো
সুন্দর সকালের উল্টোপিঠে দুঃখ-রাত

তর্জনী যতো উঠবে
বৃদ্ধাঙ্গুলি তত কাছে

ব্যক্তি এক। পথ অগাধ
বেছে নেওয়া তোমার কর্তব্য ।



দেশটার কি হবে?
          - শুভব্রত সরকার

সরকার যন্ত্র,দেয় 
ধর্ষণ এর মন্ত্র,
ধর্ষিত হয়ে রাষ্ট্র ন্যায় চায় ফুটপাতে।
চলে গোলাগুলি,দিয়ে
ধর্মের বুলি,
মৃতদের মাংস খাবে ধর্ম নুন ঢেলে জল ভাতে।
চাই ওদের নতুন নীতি,
চুলোয় যাক সম্প্রীতি,
মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে রাজা হয় এক রাতে।
সেই ছেলে গুলি,
আওরাতো বিপ্লবের বুলি,
দেশদ্রোহী আক্ষা পেয়ে মরলো তো অপঘাতে।
চুপ থাকাই শ্রেয়,কারণ ওরা
 "শক্তিশালী অপরাজেয়"
পরিবর্তন চাইলে তোমার দেহ খাবে শেয়ালতে।
জনগণ খুবই ক্লান্ত,
তবু তারা আজ শান্ত,
ফেসবুকে হ্যাজট্যাগে বলে "দেশটার কি হবে!"



অন্তরালে

        বিধানচন্দ্র রায়

হাভাতে শ্রমিকের খাতায় যতটা
                         উজ্জ্বল হয়ে উঠছি
কবিতা -- ততটাই হয়ে উঠছে
      তেতো, বিষাক্ত, ছেলেমানুষি ...

সমস্ত কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি
শ্রমিক ভাই-বোনের ঘাম,
                                চাবুকের দাগ।

চায়ের পেয়ালাতেও স্পষ্ট হচ্ছে
পাহাড়ি মেয়েটার কালশিটে তনু

দেখতে পাচ্ছি
কয়েকটা লোক ছাড়া
সবাই শ্রমিক, স্বপ্ন খোয়ানো
মৃত লাশের জীবিত রূপ --- মরণের
প্রত্যাশায় হার মানে না কেউ ...
আর ---
অন্তরালে প্রস্তুতি নিচ্ছে, সুভাষ বসু
             আবার আসবে;
             ফুল ফুটবে মানুষের জন্য।




ঘুমিয়ে আছে গল্প কত...( গদ্য )
 পল্লবী মালো

আমার অনেক গল্প আছে। তাদের একটাও আমার নিজের নয়, নিজের লেখাও নয়। যাদের গল্প তারাই লিখেছে। আজ অব্ধি পাবলিশও হয়নি কোথাও। অপ্রকাশিত সেসব গল্প আমি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি বুকের মধ্যে। আজ বলব এক এক করে। 
অবিনাশ যে মাধবীকে ভালবেসেছিল, মাধবীর আগেই জানতে পেরেছিলাম আমি। পড়ন্ত বিকেলের প্রথম আলো ওর মুখের উপর পড়লে বেশ মায়াময় লাগে। মাধবীকে আমি চোখে দেখিনি, তার অনেক গল্প শুনেছি, সবটাই কিন্তু অবিনাশের মুখে। গল্প শুনেই তারে অল্প অল্প... থাক্‌ না হয় সেসব কথা। 
তমালের তখন বয়স কত? বড়জোর ওই সতেরো-আঠারো হবে। বাবার পকেট থেকে চুরি করে ও একটা সিগারেট টেনেছিল প্রথমবার, তাও আবার দেবেনবাবুর টিউশানির ফাঁকে। তুলসি পাতা চিবিয়ে ঘরে ফিরে তমাল সেদিন আমাকেই প্রথম বলেছিল, “জীবনে প্রথমবার সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লাম”। আমিও মনে মনে হেসেছিলাম ওর উত্তেজনা দেখে। 
তানিয়া বলেছিল, স্কুলের প্রেয়ার লাইনে, ক্লাসের ফাঁকে অয়ন নাকি আড়চোখে দেখে ওকে। চোখের পলক না ফেলে লুকিয়ে লুকিয়ে... আর হঠাৎ তানিয়া দেখে ফেললেই ধরা পড়ে যায়, ভান করে ব্যস্ততার। অয়নের ওই মিছে ব্যস্ততা দেখেই মজা পায় তানিয়া। অয়নের চোখ দিয়েই নিজেকে সুন্দরী ভাবতে ভালোলাগে তানিয়ার। এ এক অদ্ভুত ভালোলাগা। যেন পুরো পৃথিবীটাই শান্ত, তাপমান স্বাভাবিক। শুধু তানিয়ার বুকের উষ্ণতাটাই বেশি, ওর হৃৎপিণ্ডেই ভুমিকম্প। লাখো-লাখো মানুষের এই  পৃথিবীতে সেই কম্পনের সাক্ষী শুধু দুজন…তানিয়া আর আমি। 
শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায়, খোয়াইয়ের পথে সৌমিত্র যখন রত্নার হাত ধরে বলেছিল, “আমার জানিস খুব ইচ্ছে, এই রবিঠাকুরের দেশে একটা ভালোবাসার সংসার গড়ার... আমার সঙ্গে পালিয়ে আসবি? শহুরে ঝঞ্ঝাট বড্ড একঘেয়ে রে”। আমি জানি ঠিক তখনই রত্নার বুকের খাঁচা থেকে ডানা মেলে উড়ে গিয়েছিল একশোখানা রঙিন পাখি। রত্নার পাও কি আর মাটিতে ছিল? দুটো পাখা নিজের শরীরেও জুড়ে দিয়েছিল ও। পথভোলা বাউলের একতারায় তখন, “আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে?” মনে আছে, সব স্পষ্ট মনে আছে আমার।
পুকুরধারের সূর্যডোবা দেখতে দেখতে রুপমের ঠোঁট ডুবেছিল পিয়ালির ঠোঁটে, পিয়ালির হৃদস্পন্দন এক লহমায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছিল। বাড়ি এসেও কমেনি সেই ধুকপুকানি। রুপমের প্রতিটা স্পর্শও পিয়ালি লিখে রেখে গেছে…শুধু আমিই জানি সেটা। ওদের প্রেম পরিণতি পায়নি শেষমেশ…কিন্তু পিয়ালির সেই গোপন ভালোলাগাটা আমার মধ্যে রেখে দিয়েছি সযত্নে।    
দশবছর আগের ফেলে আসা প্রেমকে সেদিন কলেজস্ট্রীটের রাস্তায় অচেনা ভিড়ে দেখতে পেয়েও চিনতে পারল সৌম্য। সময় ফিরতে চাইল কলেজ ক্যাম্পাসে। কিন্তু রুমার সিঁথির সিঁদুরে এসে থমকে গেল হতভাগ্য সেই সময়ও। সৌম্যর বুকের কষ্টটা দেবযানীকে বলা যায়না। প্রাক্তনের খবর জানানো যায়না বর্তমানকে। কিন্তু আমাকে তো বলাই যায়। আমার সামনে খোঁড়াই যায় ইতিহাসের কবর। 
ক্যান্সারের সঙ্গে লড়তে লড়তে কাকলি হাঁপিয়ে যাচ্ছে আজকাল। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে বারবার অতীতটাকে ফিরে দেখতে চায় ও। পাতা উল্টিয়ে দেখে কফি হাউস, রবীন্দ্রসরোবর, নন্দন আর গঙ্গার ধার... উফ্‌, কাশ্মীরের স্বর্গটা ছোঁয়া হলনা। শেষ কেমোটা নেওয়ার আগে আমার কানে কানে এসে কাকলি বলেছিল, “মরিতে চাহিনা আমি...!” বাকিটা আমি আর শুনতে পাইনি, হয়ত শুনেছে স্বর্গ...সেই স্বর্গও কি কাশ্মীরেই?
মৈনাক চলে যাওয়ার পরে, ডিপ্রেশানের একলা অন্ধকারগুলো আমার সঙ্গে কথা বলে কাটাত পর্না। চোখের জলে ভিজে যেত পৃষ্ঠা। 
অঙ্কিতা একসময় আমাকে শুনিয়েছে চাঁদের পাহাড়ের গল্প, পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়া রাজকুমারের গল্প...ওর হাতের কবিতাগুলোও লুকিয়ে রেখেছি আমি। অঙ্ক-বিজ্ঞান-এন্ট্রান্সের চাপে আজকাল শুধু ওর কলম থেকে নাভিশ্বাসই বেরোয়। কথাও হয়না আমাদের খুব একটা।  
ধর্ষণের পর গোটা মহল্লাই বাঁকা চোখেই তাকায় বৃষ্টির দিকে। ওর শরীরের মানচিত্রটাও একটু বদলেছে। মনটা বদলেছে কি? সেই মনের হদিশ পায়না কেউ... আমি ছাড়া কেই বা বোঝে ওকে? বুঝতে চায়ও বা কি কেউ? 
সৃজার জীবনে অনেক দুঃখ। কর্পোরেট অফিসের চাকুরে বাবার অহং আর সীমাহীন ঔধত্য, মায়ের বঞ্চনা আর চোখের জল... বাবা-মায়ের দাম্পত্য অশান্তিতে সৃজার জীবন থেকে হারিয়েছে সব রঙ। সৃজার ওই সাদাকালো শৈশবে মিশে থাকা যন্ত্রণাগুলো ভাষা পায় আমার কাছে এসে। মুক্তির স্বপ্ন বোনে। 
জয়ের গলায় দড়ি দেওয়ার পরে ওর সুসাইড নোট নিয়ে কাটাছেঁড়া হল কত। ওই একটুকরো কাগজে কতটুকুই বা লেখা ছিল? “ আমি আর পারলামনা...শেষ অব্ধি”। ব্যাস, অতটাই। শেষের শুরুটা জানতে হলে দেখা করতে হত আমার সঙ্গে। টেবিলের এক কোণে পড়েছিলাম আমি... সবটা জানতাম,, কিন্তু বাঁচাতে পারলামনা। ওর দেহটা যখন চিতার উত্তপ্ত কাঠে জ্বলে-পুড়ে ধোঁয়া হয়ে মিশে যাচ্ছিল বাতাসে...ওর না বলা কথাগুলো আমার বুকের ভেতর থেকেও দীর্ঘশ্বাস হয়ে উড়ে যেতে চাইছিল ওর সঙ্গে। জয় চলে গেল। ফেলে রেখে গেল অনেক না বলা কথা।  
কত কথাই তো বলা হয়না, হয়ত বলা যায়ওনা। কিন্তু লেখা হয়। আমাদের বুকের মধ্যে লেখা হয়, লেখাগুলোই থেকে যায় । লাল-নীল-হলুদ মলাটের একেকটা ডাইরির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একেকটা ইতিহাস, গুচ্ছ গুচ্ছ ফ্যান্টাসি, স্বপ্ন, হতাশা, উল্লাস, যন্ত্রণা, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তি। আমাদের বুকের মাঝেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে সভ্যতা। তুমি পাতা উল্টে দেখবে না???  
তোমরা তো কথা বলেছ, কত গোপন, কত আপন সেসব কথা। 
আজ নিষ্প্রাণ অক্ষরেরাও জাগছে। আমরা ডাইরিরা এবার সব জমে থাকা গল্পগুলো বলব। 
বন্ধু, তুমি কি শুনছো? শুনতে পাচ্ছ? 




অব্যক্ত কথা
🔸কবি-নীল আকাশ

সব অভ্যাসই একদিন অভ্যাস হয়ে ওঠে
শূন্যতা চাপা পড়ে কবরে;
দুটো মেঘ যদি আজ, অভিমানে চোট খায়
বৃষ্টি তো নামবেই সাগরে।

জমেছে পথের বালি,একরাশ বাঁধা পেয়ে
শরশয্যায়  আমি দাঁড়িয়ে,
ঝিনুক কে বলে দেখো, এতটা নিরব কেন-
মুক্ত কে দিয়েছে সে হারিয়ে।

তোমার তো মনে হবে, একলা চলতে হবে,
পুরানো সব মায়া পিছু ফেলে
কাব্য কী করে লিখি, একবার ভেবে বলো
কলমের কালি ঐ দূরে ঠেলে।

আমার ছোট্ট মনে, আলপনা আঁকা ছিল
আঁধারে হয়ত বোঝা যায়নি
শুকিয়ে গেছে ফুল,সাজিতে পড়ে থেকে;
দেবতার চরণ তা পায় নি। 




তুমি মৃত্যুর মতো রাজকীয় হয়ে এসো ( গদ্য )

দেবযানী ভট্টাচার্য
##########################
প্রতিনিয়ত হেঁটে যাই বেদনার দিকে,
সুখের প্রতিভূ হয়ে প্রচ্ছন্ন রাখি প্রগাঢ় দুঃখ গুলোকে, মুঠো খুলে বসে ছিলাম, কখন নিশ্চুপ গলে পড়ে গ্যাছে টের পাই নি।
একটা ফাঁকা প্লাটফর্মে বসে থাকি নিরালম্ব ,নিরাভরণ হয়ে।

শূন্য এক বলয়ের কেন্দ্রে নকল পূর্ণতায় ভরে উঠি। বুকের মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ হয়। বুদ্বুদ ফেটে বেরিয়ে আসতে চায় নিযুত দুঃখ গুলো,  নদীর ধারে ওদের  কান্না গুলোকে নিয়ে  কে যেন কুৎসা রটায়। নিয়ন্ত্রিত রাখি বিলাপ,অনুভূতিতে জেগে থাকে বিলাপের মতো তোমার মুখ,আমি বেদনায় হৃদয় রাখি।তুমি মৃত্যুর মতো রাজকীয় হয়ে এসো প্রিয়।



কবি বিরহ
কলমে: নীলাঞ্জন চক্রবর্তী

মোর শব্দহারা দোর, ভোগে প্রেমরোগ।
অগুনতি তারা সব ভিড় করে চোখে।
তোমার বিয়োগে দিন হল কত যোগ।
শেষ রাতে ফিরি বাড়ি যাযাবরী শোকে!

দ্বিতলে পড়ার ঘর, নেই তাতে আলো।
কলমে ফুরায় কালি আঁখি তেজী লাল।
খাতাতে কাগজ সাদা শব্দ মাখে কালো।
এঁটো পাতে চাটি ভাত, রেশনের ডাল!

লেখনীয় সংসারে যে পরকীয় লোক।
বিরহ পাহাড় শ্বাসে শীতলতা বাড়ে।
দেরাজ উপচে পড়ে, পাণ্ডুলিপি শোক।
শব্দেরই শবদেহ পচে হিমঘরে!

যে ব্যর্থ কবির সুখ শনি করে গ্রাস।
সে সঙ্গিনী অভিধান খোঁজে বারোমাস!



সৃষ্টির ছাপ
          সত্যব্রত ধর

বেকারত্বের রোদ মাথার উপর পড়তেই...
চশমার চোখ থেকে ঝুলে পরে,
কষ্টের ঘাম...!
দু-আনার ব্যস্ততার খেসারতে,
বন্ধুদের আড্ডাগুলো...
খবরহীন পোড়া ছাই হয়ে উড়ে গেছে!
ফাঁকা পকেট নেড়ে উদাস দৃষ্টি...
রঙিন স্বপ্ন ভুলে,
ছাপোষা সাদা-কালো বর্তমানই জিন্দাবাদ...!
গান রচনার পঙক্তিতে সুর দেওয়ার আগেই,
পুরোনো গীটারের সঞ্চয় ছিঁড়ে...
ক্যারিয়ার গুঁড়িয়ে যায়!
রুলটানা টাইমলাইনে...
স্যাক্রিফাইজের অজানা পথে,
সোশ্যাল ডিসটেন্সের কাঠগড়ায়...
ভ্যাবাচ্যাকা সময় বেআব্রু!
দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া...
ক্ষণিকের জনশূন্য জীবনে,
বেলাশেষে সৃষ্টির ছাপ ফেলাই...
যেনো তৃপ্তির ঢেকুর।



মনোজ

    সোমা ধর ঘোষ 

আমার ডান হাত লিখছে 
দৈনন্দিন...
জীবনের পাতায় পড়ছে দিনযানের
সোহাগী চুম্বন 

বাঁ হাতে ছুঁয়েছি তোমার মধুবন...
নীরবতার ব্যাপ্তি 
দুই কায়ার মাঝে 
হৃদয়তন্ত্রীতে বেহাগ বাজে...

বাঁ হাত তুলে নেয় তোমার মধুবনের 
একগুচ্ছ ল্যাভেন্ডার...
তুমি তখন শিহরণে---গুঞ্জরনে 

হারিয়েছে তোমার আলয়?
হে সহজিয়ার পথিক, 
আমার আলয় তোমার হোক...
রেখেছি ল্যাভেন্ডার থোক 

....আমার বাঁ হাত ডান হাতকে ধরে 
ফেলে...
চুপি চুপি বলে মন 
সকল মনোজ গোপনীয়তার
আজ করব উদযাপন...



কবিতা১

           এখন যেভাবে সাজে                      
ঋভু চট্টোপাধ্যায়

 

লোকে বললেই শূন্যতা দাঁড়কাক সাজে

দাঁড়িয়ে যায় মেঘ কুমারি রাত।

অসংখ্য তারাদের সাথে হাতে হাত ধরে

খেলতে থাকা লুডো বা দাবা তাদের

সব গুটি নিঃসরণর লাল তরঙ্গ ছুঁয়ে

ঘরে ফেরে ভুল ঠিকানার নৌকা।

এভাবে বললেও সব স্মৃতি মাখামাখি

আজন্ম রোদ্দুর ভুলে যেভাবে নামতে থাকে

একের পর এক গোটা দিন, ভাঙা দুপুর

অথবা আধ ছোঁয়া সন্ধ্যার শুরু,

চায়ের সাথে জন্ম নেয় ক্ষোভ এবং ভালোবাসা

তারপর মাটির সাথে মিশে যায় ভাঁড় ও শেষের তলানি,

জানা নেই তার কোন জীবন বীমা ছিল কিনা,

জানা নেই কোন আন্দোলনের আগে দমনের কৌশল

কে ঠিক করে, কে বলে এই বার দিন হলেই

দ্বীপান্তরে রথ যাবে, এই বার সন্ধে হলেই ঘরে ঘরে বজ্রপাত,

এই বার রাত হলেই ভুল ঘুমে জ্বলে উঠবে চোখ,

সমস্ত গ্রাফ এক্স আর ওয়াইএর মাঝে খুঁজবে ছেদ বিন্দু

অথচ কেউ কথা বলবে না, শব্দ না, এক হবে ছায়াদের অমৃত যোগ।



কবিতা২

জং ধরা সেমিকোলন              
ঋভু চট্টোপাধ্যায়

 

সেখানেই একটা পুরানো সেমিকোলনে লাগানো

রয়েছে কিশোরী বিকাল, স্মৃতি কথা মানে

শুধুই জংধরা একটা মাত্র অশান্ত উপস্থিতি

পাশে সেই বয়ে যাওয়া ছোট্ট খাল সেই চুপচাপ

বিকালের ছাপ, ফেরার সময় হাল্কা বাজার,

এখনও সেই দেরি, সেই মুখ কালো মেঘের ভার,

সেই লুকিয়ে রাখা ক্লাবের এক কোণে দাঁড়ানো

দুটো পা দরজায় লালা লেগে, সেই এক চকলেট সুখ।




Friday, 3 July 2020

রেল কলোনির আড্ডা ( পর্ব ৪ )

চিত্তরঞ্জনের ইতিহাস বলতে গেলে রেল কারখানা শুধু নয় ; আরও অনেক ইতিহাস মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই শহরের অলিতে গলিতে । এই যেমন ধরুন হলো ব্রিক্সের আবিষ্কার ; সেও তো এই চিত্তরঞ্জনেই । 


1950 সালের পয়লা নভেম্বর ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রথম ইঞ্জিনটি স্বর্গীয় দেশপ্রেমিক চিত্তরঞ্জন দাশের নামে উৎসর্গ করেন, এবং তাঁর নামানুসারে এই নতুন তৈরি প্রজেক্ট এর নাম রাখেন চিত্তরঞ্জন লোকমোটিভ ওয়ার্কস বা CLW.এবং সাথে সাথে মিহিজাম স্টেশন এর নাম বদলে রাখা হলো চিত্তরঞ্জন।


চিত্তরঞ্জন শহরটি জখন গড়ার কাজ শুরু হয়েছিল তখন এরিয়ার মোট ক্ষেত্রফল ছিল মাত্র ১৮.৩৪ স্কোয়ার কিলোমিটার ও মোট বাজেট ছিল মাত্র ১৪ কোটি টাকা । 


তখন এম গণপতি ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ। ডিভি বয়েজ স্কুলের পাশে প্রথম এডমিনিষ্ট্রেটিটিভ অফিস গণপতি হাট তাঁর নামেই তৈরি এবং তাকে সম্মান জানবার জন্য প্রথম রাস্তার নাম রাখা হলো গণপতি এভিনিউ। ধীরে ধীরে রাস্তা শহরের দিকে এগোতে শুরু করলো। ভিআইপিদের যাতায়াতের জন্য তৈরি হল ৬ নম্বর রাস্তা যেখান দিয়ে তারা সোজা কারখানা পরিদর্শনে যেতেন। ধীরে ধীরে কোয়ার্টার বানানোর কাজ আমালাদহির দিকে এগোতে লাগলো। সলিড ইঁটের তৈরি দিয়েই কোয়ার্টার বানাবার কাজ চলছিল। কিন্তু বাজেট ফিক্সড আর কর্মীর সংখ্যা অনেক। এই টাকায় কি অত সংখ্যক কর্মিকে কোয়ার্টার দেওয়া যাবে ? 


এই সময় মিস্টার থাডানি বলে এক সিভিল কন্ট্রাক্টর এগিয়ে এলেন। তিনি তাঁর নকশায় হলোব্রিক্স এর পরিকল্পনার কথা জানালেন। গণপতি সাহেবের সেটা পছন্দ হলো। অর্ডার দিলেন হলো ব্রিকস তৈরির। কিন্তু বানাবেন কোথায় ? এখন যেটা এরিয়া সিক্স বলে পরিচিত সেই ফাঁকা মাঠের মাঝখানে থাডানি সাহেব বানিয়ে ফেললেন হলো ব্রিক্স এর কারখানা। শুরু হলো সিমেন্ট বালির মিশ্রনে নতুন ধরনের ছাঁচে ফেলা হলো ব্রিকস। ইঁটের মাঝখানে ফাঁপা। ভাবা হয়েছিল  ইঁটের ভেতরে বালি ভরা হবে। তাহলে গরমে দিনের বেলায় ঠান্ডা থাকবে ঘর। কিন্তু হয় নতুন করে খরচের ভয়ে সেটা আর করা হয়নি। ভালোই সাড়া পাওয়া গেল। সেই ইঁটে কোয়ার্টার বানাতে কোনো অসুবিধে হলো না। ব্যাস জোর কদমে তৈরি হতে লাগলো হলো ব্রিকস। ইঁট বাইরে থেকে এনে যা খরচা তার অনেক কমে এই ইঁট এখানেই তৈরি হতে লাগলো। ধীরে ধীরে লোকের মুখে ওই শেডের নাম হয়ে গেল থাডানী শেড। ১৯৫০ সালে এই শেডের ওপর মাইক লাগিয়ে বাজানো হয় মহালয়া । 


কি অদ্ভুত না ! হলো ব্রিকস এর মত এক নতুন ধারণা এই চিত্তরঞ্জনেই শুরু হয় , যার ফলে এই শহর সস্তায় বাড়ি বানানোর এক অভিনব পন্থা গড়ে নজির করে তোলে । এমন ইতিহাস আরো আছে , আসলে চিত্তরঞ্জনের পাতায় পাতায় ইতিহাস । কিন্তু তবু এই শহর দাবি করতে শেখায় নি কোনদিন । বরং চিরটাকাল দিয়ে গেছে অনেক অনেক বাকিদের ।
এ শহরের জীবনযাত্রার ছোঁয়ায় তাই অজয় নদের ভূমিকা বিশাল । এ নদকে বাদ দিয়ে চিত্তরঞ্জনকে কল্পনাও করা যায় না । সুখ দুখের সঙ্গি হয়ে অজয় বয়ে চলেছে এ শহরের হৃদয় ছুয়ে । অজয় নদের ধারে গড়ে উঠেছে হনুমান মন্দিরের মত বনভোজন স্থল । প্রতি বছর শীতের কুয়াসা বুকে জড়িয়ে কতো মানুষ ভিড় করে একটু আনন্দে মেতে উঠতে । আবার ছট পুজোর আনন্দ অথবা মহালয়ার ভোরে ভিড় করা মানুষদের তর্পনের একমাত্র স্থল হয়ে উঠেছে এই অজয় । তবে একটা দিক দেখলেই চলবে না । প্রতি বছর অজয় নিজের সাথে ডেকে আনে ভয়াবহ বন্যা । গ্রামের পর গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যায় নিজের গভিরে । 


আসলে চিত্তরঞ্জন নিয়ে স্মৃতিমন্থনের অভাব নেই । এখানে পুরুষের পর পুরুষ এসেছে , থেকেছে আবার চলেও গেছে । কতো স্মৃতি আজ এর পাতায় পাতায় । তেমনই একটা স্মৃতিমোহ অধ্যায় হল টেকনিক্যাল স্কুল ; রেল যাত্রা ও আরও অনেক কিছু । একে একে সবই জানাবো । 


তবু চিত্তরঞ্জন কোনোদিন কাউকে আঁকড়ে রাখে নি নিজের মধ্যে , চিরকাল ঠেলে দিয়েছে দূরে ; প্রতিষ্ঠিত হতে  , নিজের পায়ে দাঁড়াতে । রেল ইঞ্জিনের রেল সুবিধা দিয়ে গেছে আমাদের বারবার যাতে যাতায়াতের সমস্যা না হয় । সেই রেল ইতিহাস নিয়েই আমার আজকের পর্ব । 


চিত্তরঞ্জনে রেল ইঞ্জিন তৈরির ইতিহাস অনেক পুরোনো । এই লেখার প্রথম দিকেই বলেছিলাম চিত্তরঞ্জন কে কেন বেছে নেওয়া হলো এই কারখানা তৈরির জন্য তা পরে বলবো । আজ সেদিক নিয়েই একটু আলোচনা করা যাক । চিত্তরঞ্জন বিখ্যাত হওয়ার ইতিহাস বলতে গেলে চলে আসে সেই রেল ইঞ্জিন তৈরির  ইতিহাস।এই ইতিহাসে  যেমন গর্ব বোধ হয়, ঠিক তেমনি লুকিয়ে আছে বহু বিষাদ বেদনা ভরা কাহিনী । চলুন তাহলে এই প্রাণের তৈরির শহরের সেই দিনগুলো থেকে ঘুরে আসি একবার ।


  চিত্তরঞ্জন সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল রেলওয়ে ইঞ্জিন-কারখানা তৈরি করে বিদেশ থেকে ইন্ঞ্জিন আমদানী বন্ধ করা । ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এ বিষয়ে বেশ ওয়াকিবহল ছিল যে ভারতে নতুন কারখানা নির্মাণে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে ; তবে বিদেশ থেকে ইঞ্জিন পরিবহন করতে খরচও বাড়ছিল । তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই তারা কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা করেন ।  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হাম্পারিশ এন্ড কোম্পানিকে রেল ইঞ্জিন তৈরির জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করার দায়িত্ব দিলে, এরা ভারতের চারটি জায়গা পছন্দ করেছিলো । তার মধ্যে একটি মহারাষ্ট্রের পুনেতে কাছে ঘোড়পারে, দ্বিতীয়টি মধ্য প্রদেশের ছিন্দোয়ারা জেলার জুন্নারদেও, তৃতীয়টি হরিদ্বারের কাছে  ( বর্তমানে ভেল ওযার্কসসপ) এবং চতুর্থটি বঙ্গের কাঁচরাপাড়া । চাঁদমারির নামও অবশ্য বিবেচনায় ছিল কিন্তু দেশ ভাগের ফলে এই নামটিও বাতিল করা হয় । বর্গী জলদস্যুর কথা চিন্তা করে মহারাষ্ট্রের নাম বাদ দেওয়া হয় । কয়লা খাদান পূর্ণ এলাকার জন্য বাদ পরে মধ্য প্রদেশের  নাম,  চীন সীমান্ত নিকটবর্তী হওয়ার জন্য বাতিল হয় হরিদ্বারের নাম  এবং অবশেষে কাঁচরাপাড়ার নাম,  নির্বাচনে সর্বসন্মতিক্রমে গৃহীত হয় ।


সারা ভারত জুড়ে তখন, স্বাধীনতা আন্দোলনে যুব সম্প্রদায়ের উন্মাদনা , তার ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাতছানি , তাইতো, কিছু কালের জন্য তারা ইন্ঞ্জিন কারখানা তৈরির পরিকল্পনা স্থগিত রাখলো । অবশেষে,  উপস্থিত হলো ১৯৪৭ সালের ১৫-ই আগস্ট । স্বাধীন হল ভারতবর্ষ । রেল ইঞ্জিন কারখানা তৈরীর পরিকল্পনা, বাস্তবায়িত হল না ইংরেজদের দ্বারা । স্বাধীনতা উত্তর সময়ে এই পরিকল্পনা স্থানান্তরিত হলো বিহার বাঙলা মধ্যবর্তী গ্রাম চিত্তরঞ্জনে । জনমন দুঃখ খুশির জোয়ারে ভেসে উঠলো নতুন এই প্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে । তবে শহর গঠনের কাজটা খুব সহজ ছিল না । নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠলো ইতিহাস । চলুন আজ সেই ইতিহাসের পাতায় ঘুরে আসা যাক । 


সালটা ১৯৪৮ । স্বাধীন ভারতবর্ষে চিত্তরঞ্জনে রেল ইঞ্জিন কারখানা স্থানান্তরিত তো হলো , কিন্তু এখানে কারখানা তৈরি করতে গেলে যে জমি লাগবে তার অধিকাংশটাই সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চল । তাদের সাথে কথা না বলে কোন জমিই অধিগ্রহণ করা যাবে না । রেল কর্তৃপক্ষ সেই মত কাজ শুরু করে দিলো 

বর্তমান চিত্তরঞ্জনের সাথে , তৎকালীন চিত্তরঞ্জনের একটি তুলনামূলক আলোচনা করলে ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হবে । বুঝতে পারবেন চিত্তরঞ্জন গঠনের আগে রেল কর্তৃপক্ষকে কোথা কোথা থেকে কি কি ঝামেলা পোয়াতে হয়েছিল , যার আলোচনা আজও একটা জলজ্যান্ত ইতিহাস হয়ে চিত্তরঞ্জনে রয়ে গেছে ।


তৎকালীন সময়ে অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হওয়ার সময়ে সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রাম ছিল সিমজুরী, ফতেহপুর, কুশবেদিযা, ডাঙ্গাল ও আমলাডিহি । তার মধ্যে কুশবেদিযা, ডাঙ্গাল গ্রাম দুটি অজয় নদের ওপারে বিহার অন্তর্ভুক্ত ছিল । সিমজুরী , ফতেহপুর ও আমলাদিহি ছাড়া  বর্ধমান জেলার গৌরান্ডির দাসকিযারী, পান্ডবেশ্বর এই সব এলাকায় ও  ছিল সাঁওতালদের ঘনবসতি । দামোদর নদের উভযপারে বারাবনি, সালানপুর, জামুড়িয়া, দুর্গাপুর, ফরিদপুর, কাঙসা, ইলামবাজার, তারাপীঠ ছিল একসময়ে সাঁওতাল আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম। এগুলি ধিরে ধিরে অধিকৃত হতে থাকে নগরায়নের জন্য । 


১৯৪৮ সালে চিত্তরঞ্জনের নকশা প্রস্তুত ও জমি অধিগ্রহনের কাজ শুরু হয়  । ঠিক করা হয় গ্রামগুলি অধিগ্রহণ করে রেল কারখানা নির্মিত হবে । প্রায় সকলেই সেই ডাকে সাড়া দিলেও সিমজুরী ও ফতেহপুর গ্রাম দুটি রাজি হয় নি । ওই দুটি গ্রাম ছিল সাঁওতাল অধ্যুষিত । সাঁওতালদের সাথে বহু আলোচনা করা হয় রেলের তরফে কিন্তু তারা এসব শুনতে মোটেও রাজি ছিল না । জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে রেলের সাথে সাঁওতালদের এক অসম সংগ্রাম আরম্ভ হতে থাকে । 


রেল কর্তৃপক্ষ তবু লড়াইয়ের সিদ্ধান্তে এগিয়ে যেতে চায়নি । নানা রকম প্রলোভন দেখানো হয় যাতে এই জমি সাঁওতালরা দিয়ে দেয় , কিন্তু তারা গোঁ ধরে বসে ছিল । ফলে কোন আলোর দিশা রেল দেখছিল না । যুদ্ধই মনে হচ্ছিল একমাত্র পথ । সেই পথ রক্তাক্ত , সেই পথ অসহনীয় ; তবু সেই পথই রেল কোম্পানির কাছে শেষ পথ । অতঃপর নোটিস গেলো সরকারের জমি খালি করার । সাওতাল গ্রামবাসীদের কাছে এ এক অন্ধকার দিনের সূত্রপাত ছিল । তবু তারা দমিয়ে যায় নি । অবলা সাঁওতাল ও আদিবাসীদের রক্তে ভেসে উঠলো চতুর্দিক । অবশেষে এক সমঝোতার মধ্যে দিয়ে দমিয়ে দেওয়া হলো তাদের । জয়ী হলো চিত্তরঞ্জন নির্মাণের স্বপ্ন । 


কিছু মানুষ একটি চাকরি, পাঁচশো টাকা ও একটি সাইকেলের লোভের জালে পা বাড়ালেও , কিছুজন তখনও শেষ চেষ্টা করতে চেয়েছিল । চিঠি পাঠানো হলে রেলমন্ত্রক তাদের আবেদন খারিজ করে দেয় । ধামনবেরিযা, আছড়া, আমঝোরিযা, জিমারী, দেন্দুযা, বাথানবাড়ি, হালদা, সামডি, পিথাকিযারি, বৃন্দাবনী , খাঁড়িমতি, রাঙাশলা, নোযাদিপ, ভাগা, আমুই, শিউলিবাড়ি, দনদহা, ধানগুরি প্রভৃতি গ্রামের মোড়লদের পরামর্শে অবশেষে সাঁওতালরা নিজেদের জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো । সরকারের প্রতিনিধিদের হাতে শেষ সম্বলটুকু,  জমির দলিল, হাতে তুলে দিলে নগদ এক কুড়ি টাকা  ও ব্যাঙ্কের বই দিয়ে দেওয়া হয় , যাতে লেখা ছিল প্রাপ্য টাকার অঙ্ক।   চাকুরীর জন্য ডাকা হয় কয়েকদিনের মধ্যেই আর তখনই দেওয়া হয় প্রত্যেককে এক একটি সাইকেল । 


মাত্র 14 কোটি টাকা নিয়ে চিত্তরঞ্জনের 18.34 স্কোয়ার কিলোমিটার শহর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। কারখানার ফাউন্ডেশন তৈরির কাজ চিত্তরঞ্জনেই হতো আর বাকি লোহার স্ট্রাকচার ইত্যাদি আসতো বার্নপুর এবং জামশেদপুর থেকে। তখন এম গণপতি ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ। ডিভি বয়েজ স্কুলের পাশে প্রথম এডমিনিষ্ট্রেটিটিভ অফিস গণপতি হাট তাঁর নামেই তৈরি হয় । চিত্তরঞ্জন গড়ার কাজ ১৯৪৮ সাল থেকে জোর কদমে শুরু হয় এবং ২ বছরের মধ্যে এর নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়ে যায় ।


1950 সালের পয়লা নভেম্বর ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রথম ইঞ্জিনটি স্বর্গীয় দেশপ্রেমিক চিত্তরঞ্জন দাশের নামে উৎসর্গ করেন, এবং তাঁর নামানুসারে এই নতুন তৈরি প্রজেক্ট এর নাম রাখেন চিত্তরঞ্জন লোকমোটিভ ওয়ার্কস বা CLW.এবং সাথে সাথে মিহিজাম স্টেশন এর নাম বদলে রাখা হলো চিত্তরঞ্জন। 


এই হলো একটি ইতিহাসের সূচনা , যার আদ্যপ্রান্ত সংগ্রাম আর ইতিহাসে মোড়া । চিত্তরঞ্জনের গঠনের সময় থেকেই নির্মল শহর গঠনের দিকে জোর দেওয়া হয় । রাস্তার দুপাশে মাথা তুলে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা কোয়ার্টার এক অন্য পৃথিবী সেজে ধরা দেয় আমাদের কাছে । 



( চলবে )