হিন্দু
আবদুস সাত্তার বিশ্বাস
দীপ আর সৌগত অন্তরঙ্গ দুই বন্ধু।বন্ধুত্বে তাদের কোনোদিন ফাটল ধরেনি।কিন্তু আজ হঠাৎ করে প্রবল ঝড়ে গাছের ডালপালা যেভাবে দুমড়েমুচড়ে ভেঙে পড়ে সেইভাবে তাদের বন্ধুত্ব ভেঙে পড়ল।দীপ যখন সৌগতকে বলল,"চলো সৌগত,একটা সিগারেট আছে দু-জনে খেয়ে আসি।"
সৌগত তখন বলল,"না,যাবোনা।তোমার সিগারেট তুমি খাও গে।আমার খাওয়ার দরকার নেই।"
সৌগতর এমন আচরণে দীপ বলল,"সে কি! খাবেনা কেন?কি হয়েছে?"
"যাই-ই হোক হয়েছে।তুমি আমাকে কথা বলবে না।"
"কথা বলবো না!"দীপ অবাক হল।
"না,বলবে না।"
"কিন্তু,কেন?"দীপ জিজ্ঞেস করলে পরে সৌগত বলল,"তোমার সঙ্গে আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই।আমার সঙ্গেও তোমার আর সম্পর্ক নেই।তুমি আর আমার বন্ধু নও।আমিও আর তোমার বন্ধু নই।"সৌগত একেবারে দীপের মুখের উপর যখন কথা গুলো বলল তখন আর বন্ধুত্ব থাকে?থাকল না।ভেঙে পড়ল।ফলে বন্ধুত্ব ভেঙে পড়ার বেদনায় দীপের মন খারাপ হল।এবং তার চোখে জল চলে এল।পরে দীপ চোখের জল মুছে বলল,"বেশ,কথা বলবো না।"
"হ্যাঁ,বলোনা।"কিন্তু সৌগতর মনে কোনো কষ্ট নেই।আঘাত যে দেয় তার তো মনে কোনো কষ্ট থাকে না।আঘাত যে পায় কষ্ট তার হয়।ফলে সৌগতর চোখে,মুখেও মন খারাপের তেমন কোনো ছাপ দেখা গেল না।বরং সে বলল,"তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে।"
শুনে দীপ তো বিস্ময়ে হতবাক।তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে!দীপ এতে থেকে আরো বেশি ব্যথা পেল।এবং পরে সে যখন কি ক্ষতি হয়েছে জানতে চাইল সৌগত তখন বলল যে,দীপ তাদের ঠকিয়েছে।সে তাদের ব্যাপক ক্ষতি করেছে।ফলে দীপের সঙ্গে তারা আর মিশবে না। দীপও যেন তাদের সঙ্গে আর না মিশে।কোনোদিন না মিশে।কিন্তু কিভাবে ক্ষতি করেছে সেটা বলল না।
কোনো কিছুই এমনি এমনি ভেঙে পড়ে না। ভেঙে পড়ার পিছনে অবশ্যই কারণ থাকে।তাদের বন্ধুত্ব ভেঙে পড়ার পিছনেও নিশ্চয়ই কোনো কারণ রয়েছে।সৌগত সেটা জানে।দীপকে বলেনি।যে করে হোক দীপকে সেটা জানতে হবে। জানতেই হবে।
কামিনী সৌগতর লাভার।দীপের সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে।কেননা দীপ একবার তার উপকার করেছিল।বড় একটা উপকার।কামিনীর মায়ের তখন অসুখ হয়েছিল।কি একটা অসুখ। কামিনী হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। ডাক্তার অপারেশন করতে হবে এবং ব্লাড লাগবে বলেছিল।কামিনী ব্লাডের জন্য ছোটাছুটি করেছিল।অনেক ছোটাছুটি।করেও সে কোত্থাও থেকে ব্লাড আনতে পেরেছিল না।সেকথা সে তার সকল আত্মীয়স্বজনকে জানিয়েছিল।জানানোর পর তারা সবাই ব্লাড দিতে ছুটে এসেছিল। কিন্তু বিধি বাম হলে যা হয়।কামিনীর মায়ের ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে কারও ব্লাডগ্রুপ মিলেছিল না। কারও না।একজনেরও না।শুধু কামিনীর ব্লাডগ্রুপ মিলেছিল।কিন্তু ডাক্তার তার শরীরে রক্ত কম বলে ব্লাড নিয়েছিল না।ফলে কামিনী হাসপাতালের বাইরে গাছতলায় মন খারাপ করে বসে ভাবছিল। ভাবছিল আর ভাবছিল।শুধু ভাবছিল।ভাবনা তার শেষ হচ্ছিল না।দীপ ওইসময় হাসপাতালেই ছিল।নার্সিং কোয়ার্টারের দিকে।ওখান থেকে কামিনীকে দেখে সে চিনতে পেরেছিল।পেরে কামিনীর কাছে এসেছিল।----"কামিনী,তুমি!"
"মা হাসপাতালে ভর্তি আছে।"কামিনী বলেছিল।তারপর দীপকে জিজ্ঞেস করেছিল,"তুমি?"
"আমার মা এই হাসপাতালের নার্স।মায়ের সঙ্গে একটু দেখা করতে এসেছিলাম।দেখা করে এখন বেরিয়ে যাচ্ছি।"দীপ বলেছিল।
"তাই নাকি!"শুনে কামিনী আনন্দিতা হয়েছিল। ও বলেছিল,"তোমার মাকে আমার কথাটা একটু বলে দিও।তাহলে মায়ের দেখাশোনাটা ভালো হবে।"
"সে বলে দেবো।"বলে দীপ বলেছিল,"এখানেই আমাদের বাড়ি।চলো না আমাদের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসবে!'
কামিনী বলেছিল,"মনের অবস্থা ভালো নেই, যাবোনা।"
দীপ তখন শুধিয়েছিল,"মাসিমার অবস্থা এখন কেমন?"
কামিনী কাঁদো কাঁদো হয়েছিল,"খুব একটা ভালো না।"
"কি অসুখ?"
"অসুখের নাম জানি না।"
"অসুবিধা?"
"ব্লিডিং,পেটে ব্যথা।"
"ডাক্তার কি বলছে?"
"অপারেশন করতে হবে।এবং ব্লাড লাগবে।"
"ব্লাড পাচ্ছ না?"
"না।কোত্থাও পাচ্ছি না।"
"ব্লাড দেওয়ার মতো তোমার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই?"
"আছে।সবাই এসেছিল।কিন্তু---"
"কিন্তু কি?"
"মায়ের ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে কারও ব্লাডগ্রুপ মিলল না।"
"তোমার?"
"আমার মিলল।কিন্তু শরীরে রক্ত কম বলে ডাক্তার আমার রক্ত নিল না।"
"এখন কি করবে তাহলে?"
"নির্জন গাছতলায় বসে সেটাই ভাবছি।এখন কি করবো।যত ভাবনা হয়েছে সব আমার।বাবা থাকলে এত ভাবনা হতো না।বাবা সব সামলে নিত।মাথার উপর কেউ নেই তো।"
"তার মানে!"
"বাবা বেঁচে নেই,মারা গেছে।"
"দাদা?"
"দাদা নেই।আমি প্রথম।একটা ভাই আছে। ছোট।সে আর কি করবে?"
কামিনীর কথাগুলো শুনে দীপের মনে ব্যথা লেগেছিল।এবং মায়া হয়েছিল।খুব মায়া। কামিনীর জন্য সে তখন কিছু করতে চেয়েছিল। বলেছিল,"ব্লাডের জন্য তোমাকে কিছু চিন্তা করতে হবেনা,কামিনী।আমি ব্লাডের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। চলো,ভিতরে যাই। মাসিমা কোন বেডে আছে গিয়ে দেখি।"কামিনীর সঙ্গে দীপ ভিতরে এসে দেখেছিল ফিমেল ওয়ার্ডের বাইশ নম্বর বেডে রয়েছে।দুই হাতে দুটো স্যালাইন চলছে।মড়ার মতো পড়ে রয়েছে।দেখে দীপের চোখ দুটি ভিজে গিয়েছিল।ব্লাডের সে ব্যবস্থা করতে পারবে।কিন্তু পেশেন্টের যা অবস্থা এই মুহূর্তে ব্লাড লাগবে। নাহলে যখন তখন মারা যেতে পারে।সুতরাং দীপ ব্লাডের ব্যবস্থা না করে নিজে ব্লাড দিয়েছিল।তার ব্লাডগ্রুপ কামিনীর মায়ের ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।দীপের শরীর স্বাস্থ্য বরাবরই ভালো। তখনও ভালো ছিল।ছোট থেকে খেলাধুলা করে আর খাওয়া দাওয়া ঠিকঠাক করে তো।ফলে ডাক্তার তার শরীর থেকে যতটা ব্লাড প্রয়োজন সবটুকু নিয়েছিল।কামিনীর মা তারপর বেঁচে গিয়েছিল।সেই থেকে কামিনীর সঙ্গে দীপের সম্পর্ক।তবে সেটা ভালোবাসার সম্পর্ক নয়। উপকারিতার সম্পর্ক।ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সুতরাং দীপের বিশ্বাস যে,কামিনীকে ধরলে পরে সে সেটা জানতে পারে।সৌগত নিশ্চয় কামিনীকে বলবে।না বললেও সৌগতর কাছ থেকে কামিনী জেনে নিয়ে পরে সে সেটা তাকে জানাতে পারবে।
অতএব দীপ কামিনীকে ধরল।তবে সেটা কলেজে নয়।যদিও সে কলেজে ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু দুদিন থেকে কামিনী কলেজ আসছে না।কি যে হয়েছে কলেজ আসছে না।বাধ্য হয়ে দীপ তাকে ফোনে ধরল।তা-ও আবার কয়েকবার চেষ্টার পরে। প্রথমবার রিং করে করে কেটে গেলে দ্বিতীয়বার কল করল।সেবারও রিং করে করে কেটে গেল। তৃতীয় বারও কেটে গেল।অর্থাৎ পরপর তিনবার রিং করে করে কেটে যাওয়ার পর চতুর্থ বারের বেলায় দীপ কামিনীকে ফোনে পেল।পেয়ে বলল,"কি ব্যাপার,ফোন ধরছ না কেন?"
কামিনী বলল,"তোমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করেছে।"
"কে?"
"সৌগত?"
"কেন নিষেধ করেছে?"
"তুমি আমাদের ঠকিয়েছ।তাই।"
"আশ্চর্য!আমি কি করে তোমাদের ঠকালাম?"
"তুমি হিন্দু নও।অথচ হিন্দু সেজে আমাদের সঙ্গে মিশেছ।এটা কি ঠকানো নয়?তোমার সত্য পরিচয় গোপন না রাখলে কি হতো!আমরা তোমাকে বন্ধু বলে গ্রহণ করতাম না?তোমার সঙ্গে মিশতাম না?নিশ্চয়ই মিশতাম।তাহলে এত পরিচয় লুকানোর দরকার কি ছিল শুনি!"
"আমার সত্য পরিচয় কোনটা বলছ?"
"তুমি হিন্দু নও।এটাই তোমার সত্য পরিচয়।"
"আমি হিন্দু নই তুমি জানো?"
"তুমি হিন্দু?"
"তো হিন্দু নই!আমি হিন্দু!আমার বাবা হিন্দু! আমার মা হিন্দু!আমার ঠাকুরদা হিন্দু!আমার পূর্ব পুরুষরা প্রত্যেকে হিন্দু!শুধু নামে হিন্দু নয়।সব কিছুতে হিন্দু!আর আমাকে হিন্দু নও বললে আমি মেনে নেবো?কক্ষনো মানবো না।এতে যদি মরতে হয় মরবো!
"তুমি হিন্দু তো তোমার পুরুষাঙ্গ তাহলে কাটা কেন?"
"সে কাটা থাকতেই পারে।কত হিন্দুরই পুরুষাঙ্গ কাটা আছে।"
"তুমি দেখেছ?"
"না দেখে এমনি বলছি?যদি তুমি দেখতে চাও তোমাকেও দেখাতে পারি।ছোটবেলায় লিঙ্গের নানান সমস্যার কারণে তাদের পুরুষাঙ্গ কাটা পড়ে গেছে।বলো দেখবে কি?"
"তুমি বেশি করে দেখো গে।আমার দেখার দরকার নেই।"
"দেখবেনা তো বলছ যে?আচ্ছা,আমার যে পুরুষাঙ্গ কাটা তুমি সেটা জানলে কি করে?তুমি তো মেয়েছেলে।"
"সৌগত বলেছে।"
"কি বলেছে?"
"তোমার পুরুষাঙ্গ কাটা।"
"সৌগত জানল কি করে?"
"কেন,তুমি আর সৌগত একদিন একসঙ্গে প্রস্রাব ফিরতে গিয়েছিলে না?সেদিন দেখেছে।"
"তাই বুঝি!"
"হ্যাঁ।"
"আর এই জন্যই তোমরা দু-জনে-----"
"হ্যাঁ।"কামিনী সত্যি কথাটা বলল।
দীপ তখন বলল,"তোমরা দু-জনে এ ব্যাপারে আমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা তো করতে পারতে যে,এটা আমার এরকম কেন?জিজ্ঞাসা না করে তোমরা আমার সঙ্গে কি নীচ ব্যবহার করলে!"
কামিনী বলল,"মনে ছিল না।এখন বলো।"
দীপ তখন বলল যে,আজ থেকে বছর সাতেক আগে তার লিঙ্গের মাথায় একটা ছোট ফুসকুড়ি হয়েছিল।সেই থেকে বড় রকমের ইনফেকশন হয়ে গিয়েছিল।ফলে পেচ্ছাপ করতে গেলে খুব জ্বালা যন্ত্রণা হতো।ওষুধ খেয়ে সেরেছিল না।ডক্টর ঘোষ তখন ওটা ছেটে দেয়।সেই রিপোর্ট তার কাছে এখনও আছে।দেখতে চাইলে সে দেখাতে পারে।
কিন্তু কামিনী সেটা বিশ্বাস করল না।সব তার বানানো গল্প বলে দিল।দীপও ছাড়লো না।অনর্গল সে বলতে লাগল,"তোরা বিশ্বাস কর বা না কর আমি হিন্দু।হ্যাঁ,আমি হিন্দু।দুর্গা,কালী,লক্ষ্মী,
আমার বইপাড়া*
~ সায়ন্তী সামুই