সিমজুরির পাস দিয়েই বয়ে চলেছে অজয় নদ আর এই নদের ধারে অবস্থিত চিত্তরঞ্জনের মানুষদের সুখ আর দুঃখের দুই কেন্দ্রস্থল । জীবনের মুখাগ্নি হয় এই অজয় নদের ধারে শ্মশানে আর শীতের আমেজ বুকে জড়িয়ে নিয়ে এই অজয় তীরেই হনুমান মন্দিরে মানুষের ঢল নামে বনভোজনের জন্য । নদের ওপাশে ঝাড়খন্ড আর এই নদীর বাংলা ও ঝাড়খণ্ডের মাঝে এক সীমানা হয়ে বয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে । উৎপত্তি স্থল থেকে প্রবাহিত হয়ে গোটা ঝাড়খণ্ড অতিক্রম করে অজয় চিত্তরঞ্জনের কাছে সিমজুরি দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করে৷ সিমজুরির কাছেই অজয় নদের বিস্তৃতি সবথেকে কম , তবে প্রবল বর্ষায় অজয়ের বিস্তৃতি বিশাল আকার ধারন করে । তবে অন্য সময়ে নদে সেরকম জল থাকে না । এ অবস্থায় চিত্তরঞ্জন কতৃপক্ষ দ্বারা অজয়ের ওপর সেতু নির্মাণের ফলে বাংলা ও ঝাড়খণ্ড এর মধ্যে দূরত্ব অনেক কম হয়েছে ।
সিমজুরীর দক্ষিণ দিকে, বড় কালীমন্দির অবস্থিত । এখানে মা কালী, " মা ত্রিপুরেশ্বরী " নামে পরিচিত । সিমজুরীর উত্তর দিকে " আদি কালীমন্দির" যার চারিদিকে একসময়ে ছিল কেওট বা জেলেদের বাস । সিমজুরি চিত্তরঞ্জন দ্বারা অধিগৃহিত হলে এরা চলে যায় কুশবেদিইয়া গ্রামে । এই জেলেদের আরাধ্য দেবী হিসাবে আদি কালি মন্দিরে, মা কালী এবং শিব লিঙ্গের পাশাপাশি মা মনসা র পূজাও হয়ে থাকে । এই আদি কালি মন্দিরের আর এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো মধু ঠাকুর , মন্দিরের পুরোহিত ; যিনি জন্মসূত্রে জেলে ছিল বলেই শোনা যায় ।
পুজোর হাজার ইতিহাস জড়িয়ে আছে চিত্তরঞ্জনের কোনায় কোনায় । নর্থ যদি হয় দুর্গার এলাকা , তবে সিমজুরি নির্দ্বিধায় বলা চলে কালিপুজোর ডেরা । অবশ্য এ অঞ্চলের অজয় তীরের ছট , দুর্গাপূজাও মানুষের নজর কেড়ে এসেছে সবসময় । রাতজাগা চিত্তরঞ্জনের ইতিহাস নিয়ে একটা আলোচনা করবো অবশ্যই । আপাতত শহরের দিকে নজর দেওয়া যাক ।
কালি পুজোর উজ্জ্বল রাত চিত্তরঞ্জনকে বহু যুগ ধরে আলোকিত করে আসছে । সিমজুরির বড় কালি মন্দিরটি তখন সবে সেজে উঠছে । মন্দির দেখলে যে কারোর মনে হবে ওটি একটি পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়া আর কিছুই নয় । সময়টা ওই ষাটের দশক । বাউন্ডারি বিহীন সেই মন্দিরে কমিটি বলে কিছু না থাকলেও ভক্তি বা উল্লাসের কোন ঘাটতি ছিল না । তখন পূজারী ছিলেন চট্টরাজ মহাশয় । কিন্তু হঠাৎই কিছু বাক বিতন্ডার জেরে তাকে মন্দির থেকে অপসারিত হতে হয় । নতুন স্থায়ী পূজারী নিযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত নিত্যসেবার দায়িত্ব পড়ে শ্রী যুক্ত কেষ্ট চক্রবর্তী মহাশয়ের উপর আর চট্টরাজ মহাশয়ের স্থান হয় ৮৭ ও ৮৮ নম্বর রাস্তার মধ্যে অবস্থিত ছোট কালিমন্দিরে । এই ছোট কালি মন্দিরটিও চিত্তরঞ্জনের প্রাচীন ও আদী কালি মন্দির ।
আশি ও বিরাশি নম্বর রাস্তার মাঝখানের খোলা মাঠে অবস্থিত সিমজুরী কালী মন্দিরটিই হলো চিত্তরঞ্জনের ছোট কালি মন্দির বা আদি কালি মন্দির । এই মন্দির তখন ছিল ছোট্ট এক টিনের চালে তৈরি । এই ভাবে টিনের চালে মন্দিরের ভেতরে পুজো হতে হতে ঠিক করা হয় মন্দিরের পরিধি বাড়াতে হবে। কিন্তু রেলের হাত থেকে জমি আদায় করা সম্ভব নয় । তখন সি এম ই অরুণ মুখার্জির স্ত্রী এই মন্দির তৈরির তৈরির ব্যাপারে উদ্দোগ নেন। তিনি রেলের কাছে আবেদন জানান, মন্দিরের জায়গা থেকে দূরে কর্নারে যে কুয়ো আছে সেই কুয়োকে ঘিরে এই মন্দিরের চারিপাশে পাঁচিল তুলে দেওয়া হোক অন্যথা এই মন্দিরের আশে পাশে যে খালি জমি পরে রয়েছে হটাৎ করে সেখানে যদি আন অথরাইজড অকুপেশন হয়ে যায় তাহলে আশে পাশে যে স্কুল বা কোয়ার্টার আছে সেগুলো ডিস্ট্রাব হয়ে যাবে। রেলও সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে মন্দিরের মাঠের ভেতর কুয়ো সমেত রেলের টাকায় পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দিল।
রেল যদিও এই পাঁচিল ঘিরে দিয়েছিল, তবু এই পাঁচিলের ভেতরের জায়গা কিন্তু রেলের নয়। এর পর থেকে সেই ঘেরা জায়গার ভিতরে যাত্রাপালা আয়োজন করা হতো এবং তার থেকে প্রাপ্ত লাভের টাকায় মন্দিরের কাজ করা হতে লাগলো ।
১৯৩০ সালের অনেক আগে থেকেই, ছোট, সমৃদ্ধশালী ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসেবে সিমজুরী, ফতেহপুরের অস্থিত্ব ছিল । দুটি গ্রামই ছিল সাঁওতাল অধ্যুষিত পরগণা । শস্য শ্যামলা চাষের জমি, প্রতি বাড়িতেই গবাদিপশু,হাঁস-মুরগী, মহুয়া ফল-ফুলের রসে তৈরি হাঁড়িযা এসব নিয়েই সেই সাঁওতাল পরিবারগুলি সুখে বসবাস করতো । প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার, সিমজুরীতে হাট বসতো । সেই হাটে তারা চাল, ডাল, তরিতরকারি, শাকসবজি, দুধ, দই, হাঁস-মুরগী, হাঁড়িযা বিক্রির জন্য নিয়ে আসতো । কেওট পাড়ার জেলেরা মাছ ধরে আনতো । সেসব বিক্রি করে সহজ সরল এই মানুষগুলোর সংসার বেশ চলে যেতো । বর্তমান ৮৫ নম্বর রাস্তাই ছিল তৎকালীন এই হাটের কেন্দ্রস্থল । শ্রী পরেশ ব্যানার্জির, হোমিওপাথি চালার ঘর পেরিয়ে তেঁতুল গাছটি অবধি এটি বিস্তৃত ছিল । বলে রাখি শ্রী পরেশ ব্যানার্জি ছিলেন পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভাইয়ের ছেলে এবং একজন স্বনামধন্য হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক । বহু গরিব দুখিদের তিনি বিনামুল্যে চিকিৎসা করে গেছেন । স্বয়ং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নিজে এসেছিলেন তাঁর এই দাতব্য চিকিৎসালয়ে । এ ঘটনা নিজেই এক বিরল ও গর্বের ইতিহাস । বর্তমানে কলকাতায় তাঁর ছেলে পরিমল ব্যানার্জি হোমিও চিকিৎসাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন । তাঁর অপর ছেলে প্রশান্ত ব্যানার্জিও কলকাতার নামি হোমিও চিকিৎসক ছিলেন । তবে তিনি কয়েক বছর আগে পরলোকগমন করেছেন । এখন সেই তেঁতুলগাছ ও নেই, নেই সেই পরেশ ব্যানার্জির দাতব্য হোমিওপাথি ঔষধের চালাঘর। ১৯৫০ সালে সিমজুরির অন্তরভুক্তিকরনের পর ; ১৯৭৪ সালে নগরোন্নয়ন করতে গিয়ে, চিত্তরঞ্জনের প্রশাসন নির্দয় হাতে, ঐ তেঁতুল গাছটিকে হত্যা করেছিল।
( চলবে )
সিমজুরীর দক্ষিণ দিকে, বড় কালীমন্দির অবস্থিত । এখানে মা কালী, " মা ত্রিপুরেশ্বরী " নামে পরিচিত । সিমজুরীর উত্তর দিকে " আদি কালীমন্দির" যার চারিদিকে একসময়ে ছিল কেওট বা জেলেদের বাস । সিমজুরি চিত্তরঞ্জন দ্বারা অধিগৃহিত হলে এরা চলে যায় কুশবেদিইয়া গ্রামে । এই জেলেদের আরাধ্য দেবী হিসাবে আদি কালি মন্দিরে, মা কালী এবং শিব লিঙ্গের পাশাপাশি মা মনসা র পূজাও হয়ে থাকে । এই আদি কালি মন্দিরের আর এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো মধু ঠাকুর , মন্দিরের পুরোহিত ; যিনি জন্মসূত্রে জেলে ছিল বলেই শোনা যায় ।
পুজোর হাজার ইতিহাস জড়িয়ে আছে চিত্তরঞ্জনের কোনায় কোনায় । নর্থ যদি হয় দুর্গার এলাকা , তবে সিমজুরি নির্দ্বিধায় বলা চলে কালিপুজোর ডেরা । অবশ্য এ অঞ্চলের অজয় তীরের ছট , দুর্গাপূজাও মানুষের নজর কেড়ে এসেছে সবসময় । রাতজাগা চিত্তরঞ্জনের ইতিহাস নিয়ে একটা আলোচনা করবো অবশ্যই । আপাতত শহরের দিকে নজর দেওয়া যাক ।
কালি পুজোর উজ্জ্বল রাত চিত্তরঞ্জনকে বহু যুগ ধরে আলোকিত করে আসছে । সিমজুরির বড় কালি মন্দিরটি তখন সবে সেজে উঠছে । মন্দির দেখলে যে কারোর মনে হবে ওটি একটি পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়া আর কিছুই নয় । সময়টা ওই ষাটের দশক । বাউন্ডারি বিহীন সেই মন্দিরে কমিটি বলে কিছু না থাকলেও ভক্তি বা উল্লাসের কোন ঘাটতি ছিল না । তখন পূজারী ছিলেন চট্টরাজ মহাশয় । কিন্তু হঠাৎই কিছু বাক বিতন্ডার জেরে তাকে মন্দির থেকে অপসারিত হতে হয় । নতুন স্থায়ী পূজারী নিযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত নিত্যসেবার দায়িত্ব পড়ে শ্রী যুক্ত কেষ্ট চক্রবর্তী মহাশয়ের উপর আর চট্টরাজ মহাশয়ের স্থান হয় ৮৭ ও ৮৮ নম্বর রাস্তার মধ্যে অবস্থিত ছোট কালিমন্দিরে । এই ছোট কালি মন্দিরটিও চিত্তরঞ্জনের প্রাচীন ও আদী কালি মন্দির ।
আশি ও বিরাশি নম্বর রাস্তার মাঝখানের খোলা মাঠে অবস্থিত সিমজুরী কালী মন্দিরটিই হলো চিত্তরঞ্জনের ছোট কালি মন্দির বা আদি কালি মন্দির । এই মন্দির তখন ছিল ছোট্ট এক টিনের চালে তৈরি । এই ভাবে টিনের চালে মন্দিরের ভেতরে পুজো হতে হতে ঠিক করা হয় মন্দিরের পরিধি বাড়াতে হবে। কিন্তু রেলের হাত থেকে জমি আদায় করা সম্ভব নয় । তখন সি এম ই অরুণ মুখার্জির স্ত্রী এই মন্দির তৈরির তৈরির ব্যাপারে উদ্দোগ নেন। তিনি রেলের কাছে আবেদন জানান, মন্দিরের জায়গা থেকে দূরে কর্নারে যে কুয়ো আছে সেই কুয়োকে ঘিরে এই মন্দিরের চারিপাশে পাঁচিল তুলে দেওয়া হোক অন্যথা এই মন্দিরের আশে পাশে যে খালি জমি পরে রয়েছে হটাৎ করে সেখানে যদি আন অথরাইজড অকুপেশন হয়ে যায় তাহলে আশে পাশে যে স্কুল বা কোয়ার্টার আছে সেগুলো ডিস্ট্রাব হয়ে যাবে। রেলও সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে মন্দিরের মাঠের ভেতর কুয়ো সমেত রেলের টাকায় পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দিল।
রেল যদিও এই পাঁচিল ঘিরে দিয়েছিল, তবু এই পাঁচিলের ভেতরের জায়গা কিন্তু রেলের নয়। এর পর থেকে সেই ঘেরা জায়গার ভিতরে যাত্রাপালা আয়োজন করা হতো এবং তার থেকে প্রাপ্ত লাভের টাকায় মন্দিরের কাজ করা হতে লাগলো ।
১৯৩০ সালের অনেক আগে থেকেই, ছোট, সমৃদ্ধশালী ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসেবে সিমজুরী, ফতেহপুরের অস্থিত্ব ছিল । দুটি গ্রামই ছিল সাঁওতাল অধ্যুষিত পরগণা । শস্য শ্যামলা চাষের জমি, প্রতি বাড়িতেই গবাদিপশু,হাঁস-মুরগী, মহুয়া ফল-ফুলের রসে তৈরি হাঁড়িযা এসব নিয়েই সেই সাঁওতাল পরিবারগুলি সুখে বসবাস করতো । প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার, সিমজুরীতে হাট বসতো । সেই হাটে তারা চাল, ডাল, তরিতরকারি, শাকসবজি, দুধ, দই, হাঁস-মুরগী, হাঁড়িযা বিক্রির জন্য নিয়ে আসতো । কেওট পাড়ার জেলেরা মাছ ধরে আনতো । সেসব বিক্রি করে সহজ সরল এই মানুষগুলোর সংসার বেশ চলে যেতো । বর্তমান ৮৫ নম্বর রাস্তাই ছিল তৎকালীন এই হাটের কেন্দ্রস্থল । শ্রী পরেশ ব্যানার্জির, হোমিওপাথি চালার ঘর পেরিয়ে তেঁতুল গাছটি অবধি এটি বিস্তৃত ছিল । বলে রাখি শ্রী পরেশ ব্যানার্জি ছিলেন পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভাইয়ের ছেলে এবং একজন স্বনামধন্য হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক । বহু গরিব দুখিদের তিনি বিনামুল্যে চিকিৎসা করে গেছেন । স্বয়ং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নিজে এসেছিলেন তাঁর এই দাতব্য চিকিৎসালয়ে । এ ঘটনা নিজেই এক বিরল ও গর্বের ইতিহাস । বর্তমানে কলকাতায় তাঁর ছেলে পরিমল ব্যানার্জি হোমিও চিকিৎসাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন । তাঁর অপর ছেলে প্রশান্ত ব্যানার্জিও কলকাতার নামি হোমিও চিকিৎসক ছিলেন । তবে তিনি কয়েক বছর আগে পরলোকগমন করেছেন । এখন সেই তেঁতুলগাছ ও নেই, নেই সেই পরেশ ব্যানার্জির দাতব্য হোমিওপাথি ঔষধের চালাঘর। ১৯৫০ সালে সিমজুরির অন্তরভুক্তিকরনের পর ; ১৯৭৪ সালে নগরোন্নয়ন করতে গিয়ে, চিত্তরঞ্জনের প্রশাসন নির্দয় হাতে, ঐ তেঁতুল গাছটিকে হত্যা করেছিল।
( চলবে )
No comments:
Post a Comment